বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের জীবন ও কর্ম
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস, যিনি আইনজীবী ও সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, এবং মাতার নাম ছিল গুল হাবিবা, যিনি গৃহিণী ছিলেন।
পরবর্তীতে, ১৯৪৭ এর দেশ বিভাজনের পর তার পরিবার মুর্শিদাবাদ থেকে আতঙ্কিত থাকলেও পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে শেষে রাজশাহী অঞ্চলে অবস্থান পায়। শৈশবের কিছু সময় কেটেছে তার মায়ের পার্শ্বভূমি নানার বাড়ি তথা শ্বশুরবাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শ্যামপুর এলাকায়।
ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, তাঁর পিতা ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন, তবে কিছুদিন পরে মুক্তি পান।
শিক্ষাজীবন
হাবিবুর রহমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে খুবই স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না, তবে উচ্চ শিক্ষা সম্পর্কে বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলে:
- ১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে বি.এ. (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন ।
- ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. (ইতিহাস) ডিগ্রি লাভ করেন ।
- পরবর্তীতে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আধুনিক ইতিহাস বিষয়ে ১৯৫৮ সালে স্নাতক (সম্মান) করেন ।
- সম্প্রতিক উৎসগুলোতে বলা হয়েছে তিনি আইন বিভাগের স্নাতক (Law undergraduate) ডিগ্রিও অর্জন করেন ।
- ১৯৫৯ সালে তিনি ব্যারিস্টার (Barrister) হন।
কর্মজীবন ও আইনজীবি- বিচারক জীবনের বিবর্তন
হাবিবুর রহমানের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫২ সালে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক (lecturer) হিসেবে যোগ দেন। কিছু পরবর্তী সময়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্থান করেন, যেখানে তিনি ইতিহাস বিভাগের রিডার (১৯৬২-৬৪) হিসেবে এবং আইন বিভাগের ডিন (১৯৬১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৪ সালে তিনি আইন পেশা গ্রহণ করেন এবং ঢাকা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন । এরপর বিভিন্ন আইন ও বিচারসংক্রান্ত পদে দায়িত্ব নেন:
- ১৯৬৯ সালে তিনি সহকারী অ্যাডভোকেট জেনারেল (Assistant Advocate General) হন
- ১৯৭২ সালে তিনি হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
- ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেন
- ১৯৮৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে (Appellate Division) বিচারপতি হিসেবে ওঠান
- ১৯৯০–৯১ সময়কালে, বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন, তখন হাবিবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন
- অবশেষে, ১৯৯৫ সালে তিনি প্রধান বিচারপতি (Chief Justice) হিসেবে শপথ গ্রহন করেন
তবে, ওই বছরের মধ্যেই (১৯৯৫) তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপালন
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে তৃতীয়দফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাহীনতা ও ব্যাপক রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলো তখনকার ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে সাংবিধানিক সঙ্কট দেখা দেয়। এ অবস্থায় সংবিধানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান অনুযায়ী সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে প্রধান উপদেষ্টা (তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের ন্যায় কার্যনির্বাহী প্রধান) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তিনি ৩০ মার্চ ১৯৯৬ তারিখে শপথ গ্রহণ করে বাংলাদেশের দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
স্বল্প সময়ে সরকার পরিচালনা করা সত্ত্বেও তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান করা হয় এবং সেনাবাহিনীকে সহায়ক বাহিনী হিসেবে মোতায়েন করা হয় যাতে ভোটাররা নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারেন। তাঁর নেতৃত্বে ১২ জুন ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সাতাশ বছর পর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান কোনো দল বা স্বার্থগোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করায় রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের কাছে তিনি একজন নীতিবান ও সৎ অভিভাবক হিসেবে সমাদৃত হন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পরবর্তীতে “আদর্শ মডেল” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ২০০১ ও ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর ক্ষেত্রেও নীতিমালা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
সর্ব সামগ্রিকভাবে, বিচারপতি হাবিবুর রহমান সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ২১ বছর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০০৭ সালের ট্রুথ কমিশন (Truth and Accountability Commission)
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে “ট্রুথ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি কমিশন” গঠিত হয়। এ কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল— যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিন্তু স্বেচ্ছায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হবেন, তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া।
তবে এই কমিশনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ২০০৮ সালে হাইকোর্ট এটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। ফলে কমিশনের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায় এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি।
সাহিত্য, গবেষণা ও অন্যান্য অবদানে
হাবিবুর রহমান আইন ও বিচারক্ষেত্রে অবদানের পাশাপাশি একজন প্রবল লেখক, গবেষক এবং ভাষা-সাহিত্য গবেষক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। বিভিন্ন উৎসে বলা হয়েছে যে, তিনি প্রায় ৯৫টি গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র রচনা করেছেন; আবার কিছু উৎস অনুযায়ী প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮৫টির বেশি। তাঁর রচনা বিষয়বস্তুর পরিধি ছিল ইতিহাস, আইন, ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র-গবেষণা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদি ইত্যাদি।
কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও প্রবন্ধের শিরোনাম থেকে সাধারণ ধারণা পাওয়া যায়:
- যথাশব্দ
- কোরআনসূত্র
- গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ
- রবীন্দ্রবাক্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য
- বাংলাদেশের তারিখ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)
- ভাষার আপন পর প্রভৃতি শিরোনামও পরিচিত
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার
- টোয়েন্টি-ফার্স্ট ফেব্রুয়ারি স্পিকস ফর অল ল্যাঙ্গুয়েজেস
তিনি শুধু লেখকই ছিলেন না; ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, বাংলা ভাষার প্রসার ও সুরক্ষায় অবদান রাখেন। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহারের প্রচার ও প্রবর্তনেও তিনি অবদান রেখেছেন। প্রবন্ধ ও অনুবাদ, ভাষাবিজ্ঞান ও অভিধান প্রণয়নেও অংশগ্রহণ করেছেন ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
হাবিবুর রহমান তাঁর জীবনে বেশ কিছু মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (বাংলা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে)
- একুশে পদক (২০০৭ সালে)
- অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার যেমন স্পেশাল কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান রাইটস পুরস্কার, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার, অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গবেষণা পরিষদ পুরস্কার ইত্যাদি পুরস্কার ও সম্মাননা তার বৈচিত্র্যময় অবদান এবং সমাজে প্রভাবের পরিচায়ক।
ব্যক্তিত্ব এবং রূপালী সমাপনী
হাবিবুর রহমান একাধারে নির্লোভ, নম্র, প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন বলে নানা সাক্ষ্য ও স্মৃতিকথা থেকে জানা। তিনি দেশের প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থায় ন্যায়, সংযম ও মানবিক বিচার প্রবর্তনে বিশ্বাস করতেন। একবার তিনি স্মৃতিকথায় বর্ণনা করেছেন ১৪৪ ধারা ভাঙা আন্দোলনের সময় ও গ্রেফতারের সময় তার অভিজ্ঞতা, যা তার সাহস ও অগ্রগামী মনোভাব প্রতিফলিত করে
মঙ্গলবার ১১ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেশব্যাপী শোকের বিষয় ছিল, এবং দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
উপসংহারে, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান একটি অনন্য জীবন পথপরিক্রমা অনুসরণ করেছেন — ইতিহাসবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, বিচারক, রাজনীতিবিদ এবং প্রবন্ধক হিসেবে। তাঁর শিক্ষা, নৈতিকতা, প্রজ্ঞা ও লেখণশৈলী একত্রে তাঁকে বাংলাদেশে বিচার ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
