ExplanationHomeIntl Law

মানবাধিকার কাকে বলে?

মানবাধিকার কাকে বলে?

মানবাধিকার (Human Rights) হলো সেই সার্বজনীন, সহজাত ও অহস্তান্তরযোগ্য অধিকারের সমষ্টি, যা মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারণেই প্রতিটি ব্যক্তি ভোগ করে। এই অধিকারগুলো কোনো রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নয়, বরং এটি মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদা (Inherent Dignity) এবং অবিচ্ছেদ্য সত্তার (Inalienable Self) অংশ। সহজ কথায়, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, জাতীয়তা বা অন্য কোনো অবস্থা নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যে মৌলিক সুযোগ, স্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকারী, তাই-ই মানবাধিকার। এই অধিকারের মূল লক্ষ্য হলো সমাজের প্রতিটি সদস্যের সার্বিক বিকাশ, সুরক্ষা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তবে এর চর্চা কখনোই অন্যের ক্ষতিসাধন বা প্রশান্তি বিনষ্টের কারণ হতে পারে না। এই অধিকার একই সাথে নৈতিক আদর্শ ও আইনগত অধিকার হিসেবে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সংরক্ষিত।

জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR), ১৯৪৮ সালে গৃহীত সংজ্ঞা অনুসারে, “সকল মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাঁদের বিবেক এবং বুদ্ধি আছে; সুতরাং সকলেরই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিৎ।” এই ঘোষণাপত্রটি মানবাধিকারের মূলভিত্তি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত, যা সিভিল, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের একটি বিস্তৃত ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করে, যেমন জীবনের অধিকার, নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার। জাতিসংঘের মতে, এই অধিকারগুলো অবিভাজ্য এবং আন্তঃনির্ভরশীল, অর্থাৎ একটি অধিকারের উপভোগ অন্যটির উপর নির্ভর করে এবং এগুলোর লঙ্ঘন বিশ্বশান্তি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে।

এই সংজ্ঞা শুধুমাত্র একটি ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে বলবৎকরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক সিভিল এবং রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি (ICCPR) এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি (ICESCR), যা একসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিল গঠন করে, রাষ্ট্রগুলোকে এই অধিকারগুলোকে সম্মান করা, রক্ষা করা এবং পূরণ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার অফিস (OHCHR) অনুসারে, মানবাধিকার হলো “সকল মানুষের জন্য সহজাত অধিকার, যা কোনো দেশের দ্বারা প্রদান করা হয় না, বরং যা মানুষ হিসেবে অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত।”

এই সংজ্ঞা প্রাচীনকাল থেকে বিকশিত হয়েছে, যেমন প্রাচীন গ্রিক-রোমান দর্শনে স্টোইক নীতিশাস্ত্রের প্রভাবে প্রাকৃতিক আইনের ধারণা থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় প্রাকৃতিক আইনের বিকাশ (যেমন সেন্ট থমাস অ্যাকুইনাসের চিন্তাধারা) এবং আধুনিক যুগে ম্যাগনা কার্টা (১২১৫) বা ফরাসি বিপ্লবের ঘোষণাপত্র (১৭৮৯) পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতার পর এই ধারণা বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়, যাতে মানবাধিকারকে শুধুমাত্র নৈতিক নয়, বরং আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখা হয়।

আইনবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবাধিকারের সংজ্ঞা আরও গভীরতা লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, আইনবিজ্ঞানী জন ফিনিস (John Finnis), তার ‘Natural Law and Natural Rights’ গ্রন্থে, মানবাধিকারকে প্রাকৃতিক আইনের মৌলিক ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করেছেন: “এগুলো ব্যবহারিক যুক্তির দ্বারা উপলব্ধি লাভকারী মৌলিক কল্যাণের রূপ থেকে উদ্ভূত, যা মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং সমাজের ন্যায়বিচারের জন্য অপরিহার্য।” এই সংজ্ঞা মানবাধিকারকে কেবল নেতিবাচক (যেমন নির্যাতন থেকে মুক্তি) নয়, বরং ইতিবাচক (যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার) দিক থেকেও বিবেচনা করে। অন্যদিকে, আইনবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ফ্যাগান (Andrew Fagan) ইন্টারনেট এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোসফিতে বলেছেন, “মানবাধিকার হলো সেই অধিকার যা সকল ব্যক্তির জন্য শুধুমাত্র মানুষ হওয়ার কারণে অর্জিত, যা সার্বজনীন এবং অবিভাজ্য।” এছাড়া, ফিলিপ অ্যালস্টন (Philip Alston), একজন প্রখ্যাত মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, জোর দিয়ে বলেছেন যে মানবাধিকারের সংজ্ঞায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে, কারণ “যদি সকল অধিকারকে সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, তাহলে কোনোটিই সত্যিকারের গুরুত্ব পাবে না।” এই সংজ্ঞাগুলো মানবাধিকারকে কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, বরং নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা রাষ্ট্রের উপর দায়িত্ব আরোপ করে এবং ব্যক্তির দাবির অধিকার নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের এই সংজ্ঞা সংবিধানের ৩১ থেকে ৩৫ ধারায় প্রতিফলিত হয়েছে, যা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোকে স্বীকৃতি দেয়, যদিও অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো এখনও পুরোপুরি বলবৎযোগ্য নয়। বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) অনুসারে, মানবাধিকার হলো “মানব পরিবারের সকল সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদা, যা বিশ্বশান্তি, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি।” এখানে মানবাধিকারকে মৌলিক অধিকারের চেয়ে বিস্তৃত বলে বিবেচনা করা হয়, যেখানে মৌলিক অধিকারগুলো সংবিধানে সীমাবদ্ধ এবং আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য, কিন্তু মানবাধিকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অংশ হিসেবে সকল মানুষের জন্য সহজাত।

মানবাধিকারের সংজ্ঞা শুধুমাত্র তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য অপরিহার্য। এগুলো মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, সমাজে সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে সহায়ক। ইউনিসেফের মতে, মানবাধিকার অবিভাজ্য এবং আন্তঃসংযুক্ত, যাতে শিশু বা দুর্বল গোষ্ঠীর অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থা এই অধিকারগুলোকে লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সতর্ক করে, যাতে বিশ্বের সকল দেশে এর প্রয়োগ নিশ্চিত হয়। শেষকথায়, মানবাধিকার কাকে বলে তা বোঝা মানে বোঝা যে এটি মানুষের মৌলিক সম্মানের প্রতীক, যা শিক্ষা, আইন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে রক্ষিত হতে পারে এবং যা লঙ্ঘন হলে বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলে। এই সংজ্ঞা আমাদের সকলকে দায়বদ্ধ করে এই অধিকারগুলোকে সম্মান ও প্রচার করতে।

আরও পড়ুন- জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার এর দায়দায়িত্ব ও কার্যাবলি

You cannot copy content of this page