২২ বছর কারাভোগের পর দিল্লী হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকায় মুক্তি
দিল্লী হাইকোর্টের ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন এক নির্দেশে দীর্ঘ ২২ বছর ৫ মাস ১০ দিনের বন্দিজীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন বাংলাদেশের নাগরিক আসিফ বিন নাঈম, যিনি ভারতীয় বিচারবিভাগীয় নথিতে রাজব আলী ওরফে বাবলু নামে পরিচিত।
গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি যখন মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেন, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি ছিল না, বরং তা ছিল দুই দেশের আইনি জটিলতার বেড়াজাল ভেঙে মানবিকতার এক অনন্য বিজয়। ঘটনার সূত্রপাত ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে দিল্লীর গান্ধীনগর এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের (ধর্ষণের) অভিযোগে রাজব আলী ওরফে আসিফকে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে দিল্লীর নিম্ন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সাজা প্রদান করে। আপিলের পর ২০১০ সালে দিল্লী হাইকোর্ট এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টও নিম্ন আদালতের সাজা বহাল রাখে। আসিফ তার জীবনের সোনালী সময়গুলো দিল্লীর তিহার জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অতিবাহিত করেন, যদিও তিনি শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল।
আসিফের এই দীর্ঘ কারাবাসের যবনিকাপাত ঘটাতে পর্দার আড়ালে কাজ করেছে ভারত ও বাংলাদেশের কয়েকজন আইনজীবীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও মানবিক মূল্যবোধ। এই আইনি লড়াইয়ের প্রধান কারিগর ছিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তরুণ আইনজীবী সার্থক ম্যাগগন (Sarthak Maggon) । তিনি এবং তাঁর দল কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই আসিফের মামলাটি দিল্লী হাইকোর্টে লড়েন। সার্থক ম্যাগগন আদালতের সামনে প্রমাণ করেন যে, আসিফ কেবল একজন অপরাধী হিসেবে জেল খাটেননি, বরং তিনি সংশোধনাগারে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
সার্থক ম্যাগগন আদালতকে জানান, আসিফ জেলে থাকাকালীন ওয়েল্ডিং, লঙ্গরখানায় কাজ করা, যোগব্যায়াম প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং জেল ক্যান্টিন পরিচালনার মতো দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, আসিফকে এর আগে যখন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি ই-রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াননি। সার্থক ম্যাগগনের বলিষ্ঠ যুক্তি ছিল যে, সেন্টেন্স রিভিউ বোর্ড (SRB) আসিফের মুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে বারবার একই ধরনের গৎবাঁধা অজুহাত ব্যবহার করেছে, যা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক এবং একজন মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী। মুক্তির পর সার্থক ম্যাগগন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন যে, একজন অসহায় মানুষকে বিচার পাইয়ে দিতে পারাটা তার পেশাগত জীবনের বড় প্রাপ্তি।
অন্যদিকে বাংলাদেশে আসিফের আইনি বিষয়গুলো তদারকি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আসিফকে যখন ‘রিপ্যাট্রিয়েশন অফ প্রিজনার্স অ্যাক্ট ২০০৩‘-এর অধীনে ভারত থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তর করা হয়, তখন থেকেই শিশির মনির তার মুক্তির আইনি পথ সুগম করতে কাজ করেন।
শিশির মনির বলেন, আসিফকে ২০২১ সালে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এই শর্তে যে তাকে সাজার বাকি অংশ এখানে খাটতে হবে। তবে দিল্লী হাইকোর্টের নির্দেশের পর সেই বাধা দূর হয়। শিশির মনির আসিফের মুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বলেন, দিল্লী হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কপিটি ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর পর আইনি যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, আসিফের এই কেসটি একটি বড় নজির হয়ে থাকবে, কারণ এটি প্রমাণ করে যে দুই দেশের মধ্যে বন্দি বিনিময় এবং আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে মানবিক বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। শিশির মনির আরও যোগ করেন যে, আসিফের মতো আরও অনেক বাংলাদেশী ভারতের কারাগারে সাজাভোগ শেষে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন, যাদের জন্য এই রায় এক নতুন আশার আলো।
দিল্লী হাইকোর্টের বিচারপতি নীনা বনসাল কৃণা এই মামলার শুনানিতে ভারতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি কঠোর সমালোচনা ছুঁড়ে দেন। তিনি তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন যে, সেন্টেন্স রিভিউ বোর্ড আসিফের মুক্তির আবেদন ১০ বার প্রত্যাখ্যান করেছে কেবল অপরাধের ভয়াবহতার দোহাই দিয়ে, যা সম্পূর্ণ যান্ত্রিক এবং বিবেকবর্জিত। বিচারপতি বলেন, “এসআরবি-র কাছে একজন বন্দি কেবল একটি নাম এবং কতগুলো ফাইল, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে এর পেছনে একজন রক্ত-মাংসের মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব রয়েছে।” আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, আসিফ প্রকৃত সাজার চেয়েও অনেক বেশি সময় জেল খেটেছেন এবং তার আচরণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে তার পুনরায় অপরাধ করার কোনো প্রবণতা নেই।
বিচারপতি কৃষ্ণা অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন যে, সরকারি যন্ত্রের এই অগণতান্ত্রিক কার্যপদ্ধতির কারণে আসিফের অস্তিত্ব প্রশাসনের কাছে “অদৃশ্য” হয়ে গিয়েছিল। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করে দেন যে, কেবল অপরাধের গুরত্ব দিয়ে নয়, বরং একজন বন্দির সংশোধন হওয়ার সম্ভাবনা এবং তার অতীত আচরণ বিবেচনা করেই মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
আসিফ বিন নাঈমের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দীর্ঘ দুই দশকে তিনি তার বাবা-মাকে হারিয়েছেন, হারিয়েছেন জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো। কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তির পর আসিফ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম কোনোদিন আর সূর্যের আলো দেখতে পাব না। আমি জানতাম না কীভাবে আমি মুক্তি পাব, কিন্তু ভারতের আইনজীবীরা আমার জন্য যা করেছেন তা আমি কোনোদিন ভুলব না।” আসিফ এখন তার নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে দর্জির কাজ করে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন।
তিনি জানান, তিহার জেলে থাকাকালীন তিনি যে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তা ব্যবহার করে তিনি স্বাবলম্বী হতে চান এবং বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে চান। আসিফের এই মুক্তি কেবল একটি আইনি বিজয় নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার বিচারিক ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যা দুই দেশের আইনি ব্যবস্থার মধ্যে মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
আসিফের এই মামলার বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ভারতের সেন্টেন্স রিভিউ বোর্ড জনমতের চাপ বা অপরাধের প্রকৃতির দোহাই দিয়ে বারংবার তার অধিকার খর্ব করছিল। কিন্তু দিল্লী হাইকোর্টের এই রায় প্রমাণ করেছে যে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, তা রক্ষা করা আদালতের পবিত্র দায়িত্ব। আসিফের আইনজীবীদের মতে, এই রায়টি ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য কারাগারে থাকা বাংলাদেশী বন্দিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে সার্থক ম্যাগগনের মতো আইনজীবীদের নিঃস্বার্থ লড়াকু মানসিকতা এবং বাংলাদেশের শিশির মনিরের প্রশাসনিক সমন্বয় এই জটিল মামলাটিকে সফল পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে গেছে। আসিফের কারামুক্তি আজ কেবল তার পরিবারের জন্য নয়, বরং মানবাধিকার কর্মীদের কাছেও এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১০ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসিফের এই মুক্তিকে “ন্যায়বিচারের বিলম্বিত জয়” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত এক অসহায় প্রবাসীর মুখে হাসির ঝিলিক এনে দিয়েছে।
আরও পড়ুন- ভারত বাংলাদেশ বন্দী বিনিময় চুক্তি
