জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই-কমিশন এর গঠন ক্ষমতা ও কার্যাবলি
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই-কমিশন (হাইকমিশনার অফিস) হলো জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় এজেন্সি, যা মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত সকল মানবাধিকারের উন্নয়ন ও সুরক্ষার জন্য কাজ করে। একে সংক্ষেপে জাতিসংঘ মানবাধিকার (UN Human Rights) বলে। এই এজেন্সি ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন ৪৮/১৪১ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এর প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করেছে ১৯৯৩ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলন।
UN Human Rights প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হলো জাতিসংঘের সনদ (১৯৪৫), মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা (১৯৪৮) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলোর প্রচার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই এজেন্সি বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে কথা বলে এবং সরকার, সুশীল সমাজ এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে মানবাধিকারের মান উন্নত করতে কাজ করে।
UN Human Rights জাতিসংঘ সচিবালয়ের একটি বিভাগ এবং এটি জাতিসংঘের মহাসচিবের অধীনে কাজ করে। এর প্রধান হলেন হাই-কমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস, যিনি জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক নিযুক্ত হন এবং সাধারণ পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে ৪ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। হাই-কমিশনার মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
UN Human Rights -এর সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এর একটি অফিস এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক ও দেশভিত্তিক কার্যালয় রয়েছে। এই কার্যালয়গুলো স্থানীয় পর্যায়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং সরকার ও সুশীল সমাজের সাথে সহযোগিতা করে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারে দায়দায়িত্ব ও কার্যাবলি
মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষা: সকল মানুষের জন্য নাগরিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অধিকার, যার মধ্যে উন্নয়নের অধিকার অন্তর্ভুক্ত, তা প্রচার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বল: তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে যেগুলো জীবনের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করে, তা মোকাবিলায় নিরপেক্ষভাবে কথা বলা।
সরকারগুলোর সাথে সংলাপ: মানবাধিকারের প্রতি সরকারের শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে সরকারগুলোর সাথে সংলাপে অংশ নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা।
মানবাধিকার শিক্ষা ও সচেতনতা: জাতিসংঘের মানবাধিকার শিক্ষা ও জনসাধারণের তথ্য কর্মসূচি সমন্বয় করা, যাতে বিশ্বব্যাপী মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়।
মানবাধিকার মূলধারাকর: জাতিসংঘের শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার—এই তিনটি স্তম্ভকে পরস্পর সংযুক্ত ও শক্তিশালী করতে সকল জাতিসংঘ কর্মসূচিতে মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজন করা।
বিশেষ প্রক্রিয়া ও তদন্ত: মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার এবং বিশেষজ্ঞদের সমর্থন করা এবং তাদের প্রতিবেদন জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপন করা।
ক্ষমতা বৃদ্ধি: সরকার, জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজকে মানবাধিকার সুরক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করা।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন: বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন তৈরি করে এটি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল এবং সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করা।
সংঘাত প্রতিরোধ: মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে উদ্ভূত সংঘাত প্রতিরোধে সরকার ও অন্যান্য অংশীদারদের সাথে কাজ করা।
দুর্বল গোষ্ঠীর সুরক্ষা: নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দেওয়া।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা, আঞ্চলিক সংগঠন এবং সুশীল সমাজের সাথে মানবাধিকার বিষয়ে সহযোগিতা করা।
মানবাধিকার চুক্তি সংস্থাগুলোর সমর্থ: বিভিন্ন মানবাধিকার চুক্তি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে প্রশাসনিক ও গবেষণা সহায়তা প্রদান করা।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই-কমিশনার বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর বিস্তৃত কর্মপরিধি এবং বৈচিত্র্যময় কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার, সমাজ এবং ব্যক্তিদের মধ্যে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে। এর কার্যক্রম শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধই নয়, বরং একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব গড়ার জন্যও কাজ করে।
আরও পড়ুন- বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গঠন ক্ষমতা ও কার্যাবলি
