FeatureHome

রাজসাক্ষীর বিধি-বিধান ও সুযোগ সুবিধা

একই মামলায় বা একই অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিচার চলাকালে (Trial) আদালত কোনো সহঅভিযুক্তকে (Accomplice) উক্ত মামলার ঘটনা সম্পর্কে তার জানা পূর্ণাঙ্গ ও সত্য বিবরণ আদালতের কাছে উপস্থাপনের শর্তে আদালত তাকে ক্ষমা কিংবা দণ্ড লাঘব করে দিতে পারে। আদালতের এই শর্ত মেনে নিয়ে কেউ তার সহ-অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে যদি রাজি হয় তাকে রাজসাক্ষী (Approver) বলে। এখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই অপরাধের সত্যতা স্বীকার করে (approve) এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী (রাজসাক্ষী) হিসেবে নিজেকে সোপর্দ করে।

উদাহরণ: পাঁচ জন মিলে খুন করার পর সবাই গ্রেফতার বা অভিযুক্ত হলে এদের মধ্যে একজন যদি ক্ষমা পাবার বা দণ্ড লাঘবের শর্তে আদালতের কাছে সব ঘটনা খুলে বলে তখন সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজসাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হবেন।

বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন (International crime tribunal act 1973) এর ১৫ ধারায় রাজসাক্ষী বা tender of pardon এর বিধান আছে। এছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure, 1898) এর ৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারায়ও রাজসাক্ষী বিধান রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৫ ধারায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ২৬ ধারায়, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ এর ২১ ধারায় এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ৫২ ধারায়ও রাজসাক্ষী বিধান রয়েছে।

জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী চুক্তি UNTOC, UNCAC; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনে, নেদারল্যান্ডের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court- ICC), রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারের ট্রাইবুন্যাল এবং যুগোশ্লাভিয়া গণহত্যা ট্রাইবুন্যাল, সিয়েরা লিয়ন এবং লেবাননেও গৃহযুদ্ধ ট্রাইবুন্যালেও রাজসাক্ষী বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে।

রাজসাক্ষী সংক্রান্ত ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিধান:

১. রাজসাক্ষীকে অবশ্যই অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে তার কাছে যত তথ্য আছে সব আদালতে নিরংকুশভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

২. রাজসাক্ষী হওয়া মানে সহ-অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। তাই রাজসাক্ষীকে অন্যান্য সহ-অভিযুক্তদের আইনজীবীরা জেরা (cross examination) করতে পারবে।

৩. বিচার শেষ না হয় পর্যন্ত রাজসাক্ষীকে আটক রাখা হবে, জামিনে মুক্তি দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে রাজসাক্ষী অবশ্যই নিজেকে অভিযুক্ত করতে হবে। নিজেকে অভিযুক্ত না করে শুধু অন্যদের ওপর দোষ চাপালে তাকে রাজসাক্ষী বলা যাবে না।

রাজসাক্ষীর বিধি-বিধান ও সুযোগ সুবিধা 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য নয়। ট্রাইব্যুনাল নিজস্ব আইনে ও বিধিতে পরিচালিত হয়। তবে রাজসাক্ষী সংক্রান্ত সাধারণ নীতি আইসিটিতেও প্রযোজ্য। যেমন- প্রসিকিউশনের কাছে যদি রাজসাক্ষীর সাক্ষ্য যথাযথ মনে না হয়, তবে তার ক্ষমা বা দণ্ড লাঘবের শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। সিআরপিসি ৩৩৯ ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে পৃথক মামলা করা যাবে।

১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৩৩ ধারা মোতাবেক একজন সহ-অভিযুক্ত একই মামলায় অন্য আসামিদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারে। এই বিধান অনুযায়ী শুধু রাজসাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো আসামিকে সাজা দিলে তা বেআইনি হয় না। তবে এধরনের সাক্ষ্যের বক্তব্যের সাথে অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণ না মিললে তাকে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে আদালত অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে (ধারা-১১৪(খ))।

বৃহত্তর জনস্বার্থ বিবেচনায় সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্যের অভাব থাকলে এরকম Trndre of Pardon দিয়ে রাজসাক্ষী উপস্থাপন করা হয়।

রাজসাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েকটি কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকে:

১.  রাজসাক্ষী নিজেকে বাঁচিয়ে শুধু অন্যদের ওপর দোষ চাপালে তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা অনেকক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

২. রাজসাক্ষী নিজেও একজন অভিযুক্ত অপরাধী। তার বক্তব্য বিশ্বাস করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

৩. নিজে ক্ষমা পাওয়ার শর্তে সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ প্রলোভনে পড়ে সাক্ষ্য দেয়া।

রাজসাক্ষীর ক্ষেত্রেও তার সাক্ষ্যের সাথে অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণ ও অন্য সাক্ষীদের বক্তব্যের মাঝে গড়মিল বেশি থাকলে তাকে বিশ্বাস করা হয় না। এক্ষেত্রে আদালতে Two Fold টেস্ট ইউজ করা হয়: ১. আদালত বিবেচনা করে রাজসাক্ষী অপরাধী হলেও বিশ্বাসযোগ্য কিনা? এবং ২. উক্ত রাজসাক্ষীর বক্তব্য অন্য সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত হয় কিনা? কোনো একটা নেতিবাচক হলে সেই সাক্ষ্য আমলে নেয়া হয় না।

*গ্রন্থনা- ওয়াজেদ নবী, এডিটর, জুরিস্টিকো। 

 

আরও পড়ুন- গ্রেফতার এবং আটকের পার্থক্য

You cannot copy content of this page