ExplanationHome

বাবা-মায়ের জীবনস্বত্ব রক্ষায় নতুন আইন

বাংলাদেশে ২৭ অক্টোবর ২০১৩ থেকে কার্যকর  হয়েছিল পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন। এই আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সঙ্গী নিশ্চিত করতে হবে। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা আলাদা স্থানে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। সন্তান সস্ত্রীক বা স্বপরিবারে আলাদা বাস করলেও নিয়মিত পিতা-মাতার সঙ্গে সাক্ষাত এবং ভরণপোষণের খরচ প্রদান করতে হবে।

কোনো সন্তান পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অনাদায়ে অনূর্ধ্ব ৩ মাসের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হবেন। এছাড়াও সন্তানের স্ত্রী, স্বামী বা অন্য কোনো আত্মীয় ভরণপোষণ প্রদানে বাধা দিলে বা সহযোগিতা না করলে তারাও একই শাস্তির (১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদন্ড) মুখোমুখি হবেন।  কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সামাজিক কারণে অনেক বাবা-মা মামলা করতে দ্বিধাবোধ করেন। পরিবারের মানসম্মান, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক চাপের কারণে আইনটি কার্যকরভাবে তেমন  প্রয়োগ নেই বললেই চলে বা খুবই কম। ভরণপোষণ আইন কার্যকর না হওয়ার বাস্তবতা থেকেই নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। এটি শুধু আইনি সংস্কার নয়, বরং বাবা-মায়ের প্রতি মানবিক দায়িত্বকে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার নতুন উদ্যোগ।

বাংলাদেশে পরিবার মানেই আবেগ, দায়িত্ব আর সম্পর্কের বন্ধন। কিন্তু অনেক সময় এই সম্পর্কের মাঝেই সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বাবা-মা জীবনের সঞ্চিত সম্পদ সন্তানদের হাতে তুলে দেন, অথচ সেই মুহূর্তেই তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন,আর সন্তান যদি অবহেলা করে, তখন বাবা-মা হয়ে পড়েন অসহায়।

সম্পত্তি মূলত মুসলিম আইনে হেবা, হিন্দু আইনে উইল এবং ওয়াসিয়তনামার মাধ্যমে হস্তান্তর হয়। কিন্তু হেবা করার পর বাবা-মা আর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না সেই সম্পত্তিতে,যার ফলে তারা সন্তানের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

নতুন প্রস্তাবিত সংশোধন, যা সরকার এখন সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সরকার মূলত পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের ১৯৬৩ সালের একটি রায়ের আলোকে ইউসুফ্রাক্ট রাইট বা জীবনস্বত্বের বিধান যুক্ত করতে যাচ্ছে। যার ফলে বাবা-মা তাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বাবা-মা যখন জীবনের সঞ্চিত সম্পদ সন্তানদের হাতে তুলে দেন, তখন তারা ভরসা করেন ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের ওপর, েকিন্তু বর্তমান সমাজে বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন চিত্র আঁকে যা আপনি, আমি এবং আমরা কমবেশি সবাই দেখে আসছি। সম্পত্তি হস্তান্তরের পরই তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, আর হয়ে পড়েন সন্তানের উপর নির্ভরশীল, আর তখনই দেখা দেয় অসহায়ত্বের কঠিন বাস্তবতা, যেখানে বাবা-মায়ের চোখে ভরসার আলো একসময় ম্লান হয়ে যায়। আর এই বাস্তবতা বদলাতে বাংলাদেশ সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে যুগান্তকারী সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধন অনুযায়ী, সন্তানকে সম্পত্তি দান করার পরও বাবা-মা জীবদ্দশায় সেটি ভোগদখল করতে পারবেন।বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় দুই পক্ষের সম্মতি ছাড়া কেউই সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না।এছাড়াও বিশেষ প্রয়োজনে যেমন, চিকিৎসার জন্য সম্পত্তি বিক্রি জরুরি হলে সেক্ষেত্রে জেলা জজ বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

আমি মনে করি, এই  প্রস্তাবিত সংশোধন বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

এটি শুধু আইনি সংস্কার নয়, বরং সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ।

“ভালো থাকুক সকল বাবা-মা,

পরিবর্তন আসুক দায়িত্ববোধে।”

 

*লেখক: সেলিনা আক্তার সুইটি: রিসার্চ এক্সিকিউটিভ, জুরিস্টিকো। 

 

You cannot copy content of this page