বাংলাদেশে সাক্ষী সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সাক্ষীকে প্রচলিতভাবে ‘Eyes and Ears of Justice’ বলা হয়। কারণ আদালত সাধারণত কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নয়, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ এর অধীনে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য, প্রমাণ, এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সাক্ষী হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জ্ঞান রাখেন এবং আদালতকে সেই তথ্যগুলো প্রদান করেন। একটি ঘটনা সত্য হতে পারে, একটি অপরাধ বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অন্যান্য বিষয়ের সাথে প্রয়োজন হয় সাক্ষীর।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা দেখতে পাই প্রতিনিয়তই আসামি, অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অন্যান্য স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হুমকি ও চাপের সম্মুখীন হন অনেক সাক্ষী। তখন তারা আশঙ্কা করেন যে, সত্য কথা বললে তাদের নিজের বা তাদের পরিবারের জানমালের ক্ষতি হতে পারে। ফলে তারা আদালতে উপস্থিত হতে অনিচ্ছুক হন, সাক্ষ্য পরিবর্তন করেন অথবা পূর্বে দেওয়া বক্তব্য অস্বীকার করেন। এতে করে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে যায় এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায়।
একজন সাক্ষীর কণ্ঠ অনেক সময় একজন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি সেই কণ্ঠ ভয়, হুমকি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে থেমে যায়, তাহলে সত্য আড়ালে থেকে যায় ফলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। তাই সাক্ষীর নিরাপত্তা শুধু একজন ব্যক্তির সুরক্ষার বিষয় নয় বরং এটি একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য অংশ।
দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ০৭ ডিসেম্বর ২০১৫ খ্রি. তারিখে “সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে হাইকোর্টের নির্দেশ” শীর্ষক একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
উক্ত প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ফৌজদারি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগ সরকারকে একটি পৃথক সাক্ষী সুরক্ষা আইন (Witness Protection Law) প্রণয়নের নির্দেশ প্রদান করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি হত্যা মামলায় ২০১০ সালের ১০ জুলাই হীরা ওরফে হারুনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০১২ সালের ৫ জুন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। কিন্তু মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য একাধিকবার তারিখ নির্ধারণ সত্ত্বেও কোনো সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হননি। এ অবস্থায় আসামি হীরা হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। জামিন শুনানিকালে আদালত সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান এবং সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরকে তলব করেন। আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্যে জানানো হয় যে, আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং এই কারণেই তারা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসছেন না।
উক্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন।
আদালত আরও মত প্রকাশ করেন যে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি।
এই ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় সাক্ষী সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং একটি পৃথক Witness protection Law প্রণয়নের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে সাক্ষীরা নিরাপদ বোধ করবেন। আদালতে উপস্থিত হয়ে নির্ভয়ে সত্য কথা বলতে পারবেন। এর ফলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে, অপরাধীদের দণ্ডিত করা সহজ হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। বিশেষ করে হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি, মাদক, মানবপাচার, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলাগুলোতে সাক্ষী সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি।
আন্তর্জাতিক আইনি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বর্তমানে ৫০টিরও বেশি দেশে কোনো না কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক Witness Protection Program বা Witness Protection Law বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো—
১. যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০ সালে Witness Security Program (WITSEC) প্রর্বতন করা হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে সফল সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে সুপরিচিত। মার্কিন বিচার বিভাগ এবং U.S. Marshals Service-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ কর্মসূচিটির আওতায় সাক্ষীদের নতুন পরিচয়, নিরাপদ আবাসন, স্থানান্তর এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
২. যুক্তরাজ্যে Serious Organised Crime and Police Act, 2005-এর মাধ্যমে সাক্ষী সুরক্ষার জন্য একটি সুসংগঠিত আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা, নিরাপত্তা প্রদান এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে বিকল্প উপায়ে সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে।
৩. প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০১৮ সালে Witness Protection Scheme, 2018 কার্যকর করা হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই স্কিমকে দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে সাক্ষীদের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করে নিরাপত্তা, পরিচয় গোপন রাখা এবং প্রয়োজন হলে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
৩. কানাডায় ১৯৯৬ সালে Witness Protection Program Act প্রণয়ন করে। এই আইনের অধীনে সাক্ষীদের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং নতুন পরিচয় প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
৪. অস্ট্রেলিয়া ১৯৯৪ সালে Witness Protection Act প্রণয়ন করে। আইনটি ফেডারেল পুলিশকে ঝুঁকিপূর্ণ সাক্ষীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করে।
৫. দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৮ সালে Witness Protection Act প্রণয়ন করে। এই আইনের মাধ্যমে সাক্ষীদের জন্য নিরাপদ আবাসন, পরিচয় গোপন রাখা এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিধান করা হয়েছে।
৬. ইতালি ১৯৯১ সাল থেকে বিশেষ সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। বিশেষত মাফিয়া ও সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদানকারী ব্যক্তিদের জন্য ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
৭. জার্মানিতে Witness Protection Harmonisation Act-এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সাক্ষীদের সুরক্ষা প্রদান করা হয়। গুরুতর অপরাধের মামলায় সাক্ষীদের পরিচয় গোপন রাখা এবং প্রয়োজন হলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
৮. নিউজিল্যান্ড এ Evidence Act এবং Police Witness Protection Programme-এর মাধ্যমে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মামলায় সাক্ষীদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়।
৯. ব্রাজিলে ১৯৯৯ সালে Federal Witness Protection Program (PROVITA) চালু করে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সাক্ষী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা, স্থানান্তর এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে United Nations ২০০০ সালে গৃহীত United Nations Convention against Transnational Organized Crime (UNTOC)-এর Article 24 অনুযায়ী এর সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে সাক্ষী সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। ফলে বর্তমানে সাক্ষী সুরক্ষা আধুনিক বিচারব্যবস্থার একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
বাংলাদেশে সাক্ষী সুরক্ষার জন্য এখনো কোনো পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী সুরক্ষা আইন (Witness Protection Law) প্রণয়ন করা হয়নি। তবে বিদ্যমান কিছু আইন, বিচারিক ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, প্রথমত, বিদ্যমান আইনের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এ সাক্ষী সুরক্ষার সবচেয়ে স্পষ্ট বিধান পাওয়া যায়। এই আইনের ধারা ২৩A অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল সাক্ষীর নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৫০৬ অনুযায়ী ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হুমকি দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিরত রাখা বা প্রভাবিত করার চেষ্টা প্রতিরোধ করা যায়।
অন্যদিকে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ধারা ১৫১ ও ১৫২ আদালতকে এমন প্রশ্ন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেয়, যা সাক্ষীকে অপমান, হয়রানি বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিব্রত করতে পারে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর মাধ্যমে বিশেষ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব বিধান শুধু মাত্র সাময়িক ভাবে স্বল্প সময়ের জন্য সাক্ষীদের আশ্রয় দান করে।
বাংলাদেশে সাক্ষীদের জন্য একটি পৃথক সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রয়োজন, যেন আইনে উল্লিখিত বিধি-বিধানগুলো দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
একজন সাক্ষী শুধু আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় নয়, মামলার আগে, চলাকালীন এবং মামলার পরেও নানা ধরনের ভয়, হুমকি বা প্রতিশোধের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। তাই শুধু সাময়িক নিরাপত্তা নয়, বরং সাক্ষী ও তার পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এই আইনের মাধ্যমে সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এর ফলে সাক্ষীরা নির্ভয়ে সত্য তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।
সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের জন্য প্রথমে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন, বিচারব্যবস্থা এবং সাক্ষীদের বাস্তব সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের খসড়া তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের যেসব দেশে কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন রয়েছে, তাদের আইন ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী একটি আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।
এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা যায়, প্রয়োজন হলে তাকে নিরাপদ স্থানে রাখা যায় এবং সাক্ষী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া সাক্ষীকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আইন কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা গঠন এবং পর্যাপ্ত সরকারি অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সবশেষে, আইনটি দ্রুত প্রণয়ন ও কার্যকর করার জন্য সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। কারণ বর্তমান সময়ে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন শুধু মাত্র সাক্ষীকেই সুরক্ষা দিবে না বরং এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করবে, অপরাধ দমনে সহায়তা করবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে আরও শক্তিশালী করবে। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলে সাক্ষীরা ভয় বা চাপ ছাড়াই সত্য তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন, যার ফলে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা সহজ হবে।
*লেখক: নোহা ভূঁইয়া: লিগ্যাল এম্বাসেডর, জুরিস্টিকো।
নোহা ভূঁইয়ার আরো লেখা পড়ুন- ন্যায়পালের দায়দায়িত্ব ক্ষমতা ও কার্যাবলি
