জিজিয়া কর বলতে কী বুঝায়?
‘জিজিয়া’ (جزية) শব্দটি আরবি ‘জাযা’ (جزاء) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিনিময়’ বা ‘প্রতিদান’। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় (শরীয়াহ) অমুসলিম নাগরিকদের ((ধিম্মি বা protected people) জান-মালের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং তাদেরকে সামরিক দায়িত্ব (যেমন-যুদ্ধ) থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা নিরাপত্তামূলক বার্ষিক কর হলো জিজিয়া কর (Jizya Tax)।
জিজিয়া কর পবিত্র কুরআনের সুরা তাওবা’র (৯:২৯) আয়াতে উল্লেখিত রয়েছে, উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে: “যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে না… তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিজিয়া প্রদান করে” (Fight those who do not believe in Allah… until they pay the jizya with willing submission)। এই আয়াতটি ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত খিলাফত বনাম বাইজেন্টাইনদের তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। এসময় এই কর আহলে কিতাবদের (People of the Book, যেমন খ্রিস্টান ও ইহুদি) উপর প্রযোজ্য বলে ব্যাখ্যা করা হয়। পরবর্তীকালে জরথুস্ট্রিয়ান, হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপরও ধারর্য হয়।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ক্লাসিকাল মুফাসসিরগণ (যেমন: ইবনে কাসির, আল-কুরতুবি) বলেন, জিজিয়া হলো শান্তিচুক্তি ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক, ধর্মান্তরের বাধ্যবাধকতা নয়।
পবিত্র হাদিসে জিজিয়ার উল্লেখ আছে কিন্তু হাদিসে এর পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয়নি; উদাহরণস্বরূপ, সহিহ বুখারি (হাদিস নং ২০৭৬) এবং অন্যান্য সুন্নাহে এটি অমুসলিম নাগরিকদের সুরক্ষার বিনিময়ে একটি চুক্তি হিসেবে বর্ণিত। এই কর মূলত পুরুষ, প্রাপ্তবয়স্ক, কর্মক্ষম অমুসলিমদের উপর ধার্য হয়। মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, উন্মাদ, দাস, যাজক (monks) এবং অভাবগ্রস্তদের অব্যাহতি দেয়া হয় জিজিয়া কর থেকে। খলিফা হযরত উমর (রা.) এক বৃদ্ধ ইহুদিকে জিজিয়া দিতে অক্ষম দেখে রাষ্ট্রীয় কোষাগার (Bayt al-Mal) থেকে ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
জিজিয়া করের ধারণা সুপ্রাচীন, যা সাসানীয় (Sasanian) এবং বাইজেন্টাইন (Byzantine) সাম্রাজ্যের কর ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত। এর উৎপত্তি মধ্য পারস্যের *gazītak* শব্দ থেকে হতে পারে, যা নিম্নশ্রেণীর নাগরিকদের উপর ধার্য একটি কর ছিল, যা থেকে অভিজাত এবং ধর্মীয় নেতাদের থেকে অব্যাহতি দেয়া হতো। ইসলামি বিজয়ের পর (৭ম শতাব্দী), এটি খারাজ (kharaj, ভূমি কর) এর সাথে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে, যা বাইতুল মাল (Bayt al-Mal, রাষ্ট্রীয় কোষাগার) এ জমা হতো এবং সেনাবাহিনী, পেনশন এবং কখনও অমুসলিমদের সাহায্যের জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি অমুসলিমদের জন্য জাকাতের (zakat, মুসলিমদের ধর্মীয় অবশ্যপালনীয় কর্তব্য) সমতুল্য, যা সামরিক সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের বিনিময়ে আদায় করা হয়। ইসলামি খিলাফতের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর এবং হযরত উমরের আমলে (Rashidun Caliphate), এটি যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করা অঞ্চলে স্থানীয় চুক্তির ভিত্তিতে প্রয়োগ করা হয়, যেমন হিরাহ শহরের সাথে খিলাফতের সেনাপতি হযরত খালিদ ইবন ওয়ালিদের চুক্তি: “যদি আমরা তোমাদের রক্ষা করি, তাহলে জিজিয়া দিতে হবে; না হলে নয়।” এটি যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যা অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণ না করে বসবাসের সুযোগ দেয়।
উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খিলাফাতের যুগে এটি রাজস্বের প্রধান উৎসে পরিণত হয়, যেমন ইরাক-সিরিয়ায় ১-৪ দিনার হারে ধার্য। খলিফা হযরত উমর ইবন আব্দুল আজিজের আমলে ধর্মান্তরিতদের অব্যাহতি দেওয়া হয়, কিন্তু এটি রাজস্ব কমিয়ে দেয় বলে কিছুক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়। ভারতে ১১শ শতাব্দী থেকে দিল্লি সালতানাতে প্রচলন হয়; আলাউদ্দিন খিলজি খেলাপিদের দাসত্ব বৈধ করেন, ফিরোজ শাহ তুঘলক ব্রাহ্মণদের জিজিয়া কর থেকে অব্যাহতি দেন কিন্তু সাধারণ হিন্দুদের হার বাড়ান। সম্রাট আকবর ১৫৭৯ সালে বাতিল করেন, কিন্তু আওরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে পুনঃপ্রবর্তন করেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যে (Ottoman Empire) ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত চালু ছিলো, যেখানে এটি মাকতু (maqtu, সম্মিলিত) হিসেবে আদায় করা হতো। আধুনিক যুগে জিজিয়া কর বিলুপ্ত, কিন্তু আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবান এবং আইএসআইএলের মতো গোষ্ঠী পেশোয়ার (২০০৯) এবং রাক্কায় (২০১৪) পুনরায় অমুসলিম নাগরিকদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেছে।
জিজিয়া করের প্রয়োগ স্থান-কাল-সামর্থ্য অনুসারে পরিবর্তনশীল; এটি বার্ষিক, নগদ বা জিনিসপত্রের মাধ্যমে (কিন্তু শূকর বা মদ নয়) প্রদান করা যায়। হযরত উমরের আমলে ধনীদের জন্য ৪৮ দিরহাম, মধ্যবিত্তের জন্য ২৪ এবং দরিদ্রের জন্য ১২ দিরহাম ধার্য হয়। করসংগ্রহকারী মুসলিম হতে হয়, এবং কিছু ফকিহ (jurists) যেমন আল-নাওয়াভী এবং ইবন কুদামাহ অপমানজনক সংগ্রহ (যেমন পায়ে হেঁটে প্রদান) নিষিদ্ধ করেন, এটিকে ইসলামি মমত্ববোধের বিরুদ্ধে বলে।
যদি রাষ্ট্র সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আদায়কৃত জিজিয়া ফেরত দেওয়া হয়, যেমন আবু উবায়দাহ রোমান হুমকির সময় সিরিয়ায় ফেরত দেন। উসমানীয় যুগে সম্প্রদায়গতভাবে (collectively) আদায় হতো, এবং সামরিক বাহিনীতে যোগদানকারী অমুসলিমরা অব্যাহতি পেত। জিজিয়া অনাদায়ে শাস্তি কারাদণ্ড বা কিছু ক্ষেত্রে দাসত্ব দেয়া হতো, যেমন দিল্লি সালতানাতে।
জিজিয়া করের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ইসলামি রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ায়, যা সেনাবাহিনী এবং কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়, কখনও অমুসলিমদের সাহায্যে (যেমন হযরত উমরের আমলে ইহুদিদের পেনশন)। কিন্তু এটি ধর্মান্তরণকে উৎসাহিত করে, যেমন আব্বাসীয় যুগে কৃষকদের ধর্মান্তরণ নিষিদ্ধ করা হয় রাজস্ব রক্ষার জন্য। ভারতে এটি বিদ্রোহ সৃষ্টি করে, যেমন দাক্ষিণাত্যে ১৭০৪ সালে স্থগিত করা হয়।
জিজিয়া অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয় কিন্তু তা তাদের রাষ্ট্রের চোখে ২য শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে পরিচয় করায় (adhillā’ maqhūrīn, subdued), যা তাদের জন্য অপমানজনক, এ ব্যবস্থা সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বাড়ায়।
জিজিয়া কর অমুসলিমদের সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান, যা বহুত্ববাদকে (pluralism) উৎসাহিত করে। এটি প্রগ্রেসিভ (progressive) হারে ধার্য, যা দরিদ্রদের অব্যাহতি দেয় এবং দুর্যোগকালে মওকুফ (waived) করা হয়, যেমন কুদ্স বিজয়ী সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবীর আমলে ক্রুসেডের সময় রাজস্ব থেকে বাইতুল মাল অমুসলিমদের সাহায্য করে, যা সাম্যতা নিশ্চিত করে।
জিজিয়া করের সমালোচনা হিসেবে এর ধর্মীয় বৈষম্যমূলক প্রকৃতির কারণে, যা অমুসলিমদের অসম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, যেমন ফখর আল-দিন আল-রাজি এবং মালিক ইবন আনাস একে “humble” করার উপায় বলে। আধুনিক পণ্ডিত যেমন খালেদ আবু আল ফাদল এটিকে জাতি-রাষ্ট্র যুগে অনুপযোগী বলেন, এবং ইউসুফ আল-কারাদাভী সামরিক বাহিনীতে অমুসলিমদের না নেয়ার বদলে কর নেয়ার বিধান বাতিলের পক্ষে। সমালোচকরা যেমন রবার্ট হোয়ল্যান্ড এবং ড্যানিয়েল সিড জিজিয়াকে নিপীড়নের হাতিয়ার বলে অ্যাখা দেয়, তাদের মতে এ কর অপমানজনক এবং দাসত্বমূলক। ভারতীয় উপমহাদেশে মডারেট ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তা মাওলানা আবুল আলা মওদুদী জিজিয়া পুনরারোপের পক্ষে থাকলেও, অন্যান্য মধ্যপন্থী মুসলিমরা একে আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে অসঙ্গত বলে প্রত্যাখ্যান করেন, যেমন ২০১৬ সালের মরক্কোর মারাকেশ ডিক্লারেশনে ধিম্মি ব্যবস্থাকে অপ্রচলিত ঘোষণা করা হয়।
গ্রন্থণা: ওয়াজেদ নবী, এডিটর, জুরিস্টিকো।
আরও পড়ুন- ওয়াকফ কি?
