ExplanationHome

ওয়াকফ কী?

ওয়াকফ (Waqf, আরবি: وَقْف‎, বহুবচন: أوقاف, awqāf) হলো ইসলামী শরিয়াহ (Sharia) অনুসারে একটি অব্যাহত দাতব্য উৎসর্গ বা এন্ডাউমেন্ট (endowment), যাতে একজন মুসলমান ব্যক্তি তার সম্পত্তি (যেমন জমি, ভবন, অর্থ বা অন্যান্য সম্পদ) আল্লাহর মালিকানায় নিবেদিত করে দান করে, যাতে সেই সম্পত্তির মূল অংশ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং তার থেকে উৎপন্ন লাভ (revenue) ধর্মীয়, দাতব্য বা সমাজকল্যাণমূলক কাজে (যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, দরিদ্রদের সাহায্য) ব্যবহৃত হয়। এর আক্ষরিক অর্থ “বন্দীত্ব বা নিষিদ্ধকরণ” (confinement and prohibition), যা সম্পত্তিকে বিক্রি, দান বা উত্তরাধিকার থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করে আল্লাহর পথে (fi sabilillah) নিবেদিত করে, এবং এটি সাদাকাহ জারিয়াহ (ongoing charity) হিসেবে বিবেচিত হয় যা দাতার মৃত্যুর পরও সওয়াব (reward) প্রদান করে চলতে থাকে। ওয়াকফ ধারণাটি ইসলামী সমাজে সম্পত্তির সুরক্ষা এবং সমাজকল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যা ইংরেজি ট্রাস্ট (trust) এর সাথে তুলনীয় কিন্তু আরও ধর্মীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত।

 

ওয়াকফের ধর্মীয় ভিত্তি ইসলামের মূল উৎস কুরআন এবং হাদিস (Hadith) থেকে উদ্ভূত, যদিও কুরআনে সরাসরি “ওয়াকফ” শব্দটি উল্লেখ নেই কিন্তু এর সারাংশ বিভিন্ন আয়াতে পাওয়া যায়, যেমন সুরা আল-ইমরান (Al-Imran) ৩:৯২: “তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয়বস্তু থেকে খরচ করবে।” অথবা সুরা আল-হাদিদ (Al-Hadid) ৫৭:১৮ যা দানের পুরস্কারের কথা বলে। হাদিসে এর স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, যেমন সাহাবী হয়রত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) খায়বারের জমি নবী হয়রত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নিকট নিয়ে গেলে তিনি বলেন: “তুমি যদি চাও, তাহলে তার মূল অংশকে আটকে রাখো (habasta aslaha) এবং তার থেকে সাদাকাহ করো (tasaddaqta biha)”, যাতে জমিটি বিক্রি, দান বা উত্তরাধিকার না হয় এবং তার লাভ দরিদ্র, আত্মীয়, দাসমুক্তি, জিহাদ (jihad), ভ্রমণকারী এবং অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হয় (সহীহ বুখারী ২৫৮৬, সহীহ মুসলিম ১৬৩৩)। আরেক হাদিসে নবী (সা.) বলেন: “মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি ব্যতীত: সাদাকাহ জারিয়াহ, উপকারী জ্ঞান এবং সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” এই ভিত্তিতে ওয়াকফ ইসলামের প্রথম দিক থেকে (নবী (সা.)-এর সময়ে মদিনার দরিদ্রদের জন্য তারিখ বাগান ওয়াকফ) সমাজকল্যাণের একটি মূল স্তম্ভ হয়ে উঠেছে।

 

ওয়াকফের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে, যা তার উদ্দেশ্য এবং সুবিধাভোগী (beneficiaries, আরবি: mawquf ‘alayh) অনুসারে বিভক্ত। প্রধানত, waqf khairi বা charitable waqf যা সাধারণ জনগণ বা দরিদ্রদের জন্য (যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, কবরস্থান, পানির ফোয়ারা), waqf ahli বা family waqf (waqf alal-aulad) যা দাতার পরিবার বা বংশধরদের জন্য (যাতে পরবর্তীতে দাতব্য কাজে পরিণত হয়), এবং মিশ্র waqf যা উভয় উদ্দেশ্য মিলিয়ে। অন্যান্য প্রকারের মধ্যে waqf by user (যেমন কবরস্থান বা সরাইখানা), waqf mushrutul-khidmat (সেবামূলক, যেমন ইমাম বা খাদিমের জন্য), waqf istithmar (বিনিয়োগমূলক, যাতে আয় দাতব্য কাজে ব্যবহৃত), এবং waqf mubashar (সরাসরি সেবামূলক)। সম্পত্তি স্থাবর (immovable, যেমন জমি) বা চলমান (movable, যেমন অর্থ বা শেয়ার) হতে পারে, কিন্তু হানাফি মাযহাবে (Hanafi school) চলমান সম্পত্তির ওয়াকফ সীমিত শর্তসাপেক্ষ। এই প্রকারগুলো ইসলামী সমাজে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দারিদ্র্যবিমোচনে ভূমিকা রাখে।

 

ওয়াকফ তৈরি হয় দাতা বা waqif (আরবি: واقف)-এর স্পষ্ট ঘোষণা (declaration) এর মাধ্যমে, যা মৌখিক বা লিখিত (waqfiyya বা endowment deed) হতে পারে, এবং এটি অপ্রত্যাহারযোগ্য (irrevocable) হয়ে যায়। দাতার যোগ্যতা: প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মনের মুসলিম, সম্পত্তির পূর্ণ মালিক (absolute owner), ঋণমুক্ত এবং স্বেচ্ছায় দানকারী। শর্তসমূহ: সম্পত্তি হালাল (halal) হতে হবে, সুবিধাভোগী স্পষ্ট (যেমন দরিদ্র, পরিবার বা মসজিদ), উদ্দেশ্য ধর্মীয় বা দাতব্য (pious, religious or charitable), এবং চিরস্থায়ী (perpetual)। তৈরির উপায়: জীবদ্দশায় (inter vivos), উইল (will বা testamentary, মৃত্যুর পর কার্যকর, সম্পত্তির ১/৩ অংশ পর্যন্ত), মৃত্যুকালীন অসুস্থতায় (marz-ul-maut), বা দীর্ঘকালীন ব্যবহার দিয়ে (by immemorial use)। সম্পত্তির দখল (possession) প্রশাসকের কাছে হস্তান্তরিত হয়, এবং এটি শরিয়াহ-সঙ্গত হতে হবে, অন্যথায় অবৈধ।

ওয়াকফের প্রশাসন mutawalli বা nazir (আরবি: متولي, administrator or trustee)-এর দায়িত্ব, যিনি দাতা বা আদালত-নিযুক্ত হন এবং সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, আয় বিতরণ এবং হিসাব রাখেন, কিন্তু সম্পত্তি বিক্রি বা পরিবর্তন করতে পারেন না (যদি না অনিবার্য হয়)। mutawalli-এর যোগ্যতা: বিশ্বস্ত, দক্ষ, প্রায়শই মুসলিম (হানাফি মতে অমুসলিমও সম্ভব)। ওয়াকফের সমাপ্তি (termination) সাধারণত ঘটে না, কিন্তু সম্পত্তি ধ্বংস হলে, উদ্দেশ্য অসম্ভব হলে (doctrine of cy-pres দিয়ে অনুরূপ উদ্দেশ্যে স্থানান্তর), দাতা ধর্মান্তরিত হলে বা আইনি কারণে (যেমন অবৈধতা)। এটি ইসলামী সমাজে সামাজিক সেবা প্রদান করে, যেমন উসমানীয় যুগে হাসপাতাল (bimaristan) বা ফোয়ারা (fountains)।

 

আধুনিক কালে ওয়াকফের আইনি দিক বিভিন্ন দেশে নিয়ন্ত্রিত, যেমন বাংলাদেশে ওয়াকফ অর্ডিন্যান্স ১৯৬২ (সংশোধিত ২০১৩) যা ওয়াকফ সম্পত্তির হস্তান্তর, উন্নয়ন এবং প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে বিশেষ কমিটি (special committee) সুপারিশ করে এবং সরকার অনুমোদন দেয়, এবং ওয়াকফ প্রশাসক (waqf administrator) তত্ত্বাবধান করে। ভারতে ওয়াকফ অ্যাক্ট ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১৩) যা সেন্ট্রাল ওয়াকফ কাউন্সিল (Central Waqf Council) এবং স্টেট ওয়াকফ বোর্ড (State Waqf Boards) দিয়ে পরিচালিত হয়, এবং মুসলমান ওয়াকফ ভ্যালিডেটিং অ্যাক্ট ১৯১৩ যা পরিবারীয় ওয়াকফকে বৈধ করে। এই আইনগুলো নিবন্ধন (registration), জরিপ (survey), বিরোধ নিষ্পত্তি (tribunals) এবং অপব্যবহার রোধ করে, যাতে ওয়াকফ দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। যদিও ওয়াকফ এস্টেট কখনও কখোনও দুর্নীতি বা অদক্ষতার কারণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।

 

আরও পড়ুন- ভারতে ওয়াকফ আইনের বিতর্কিত ধারার উপর সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ

 

You cannot copy content of this page