বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষা: আইন ও নাগরিক দায়িত্ব
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। বনাঞ্চল, পাহাড়, নদী ও হাওরাঞ্চল জুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখপাখালি বিচরণ করে, যাদের অস্তিত্ব প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যই নয়, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্বেও অপরিহার্য।
আধুনিকায়নের দৌড়ে আমরা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীলতা হারাতে বসেছি। বন দখল, নির্বিচারে গাছ কাটা, বন উজাড় করা, অবৈধ শিকার ও প্রাণী পাচারের মতো কর্মকাণ্ড বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। বন্যপ্রাণীর অনিয়ন্ত্রিত হত্যা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ, যা প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয়।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইনগত কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০১২ সাল প্রণীত “বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২” অনুযায়ী দেশের যেকোনো সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার, আটক, পরিবহন বা বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শাস্তি যোগ্য অপরাধ। এই আইনের ধারা ৩৬(১)-এ বলা হয়েছে, যদি কেউ অনুমতি ছাড়া বাঘ বা হাতির মতো সংরক্ষিত প্রাণী হত্যা করে, তবে তার বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা যেতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে, দণ্ডের পরিমাণ বেড়ে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে আত্মরক্ষার্থে প্রাণী হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে, সেই ক্ষেত্রে এই শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হবে না।
এছাড়া অন্যান্য সংরক্ষিত স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন হরিণ, বনবিড়াল, শকুন, কচ্ছপ ইত্যাদি হত্যা বা শিকারের ক্ষেত্রে ও কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ধারা ৩৭(১) অনুযায়ী, কেউ যদি চিতা বাঘ, কুমির, উল্লুক, তিমি ইত্যাদি হত্যা করে, তবে প্রথমবারে ৩ বছর জেল বা ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা, পুনরায় করলে ৫ বছর বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা হতে পারে।
আইনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীর দেহাংশ বা তা থেকে প্রস্তুত কোনো পণ্য বিক্রি বা কেনাবেচা করাও অপরাধ। ধারার ৩৭(২) অনুযায়ী, প্রথমবারে ২ বছর জেল বা ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, পুনরায় করলে ৪ বছর বা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা হতে পারে ।
ধারা ৩৮ অনুযায়ী পাখি হত্যা ও দেহাংশ রাখা অপরাধ। যদি কেউ তালিকাভুক্ত পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করে, তাহলে তা আইনত অপরাধ। প্রথমবার করলে ১ বছর জেল বা ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, আর একই কাজ আবার করলে ২ বছর জেল বা ২ লক্ষ টাকা জরি মানা হতে পারে। এছাড়া এসব পাখির মাংস, পালক বা দেহের অংশ সংগ্রহ, রাখা, কেনাবেচা বা বহন করলে ও প্রথমবারে ৬ মাস জেল বা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা, আর পুনরায় করলে ১ বছর জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরি মানা হতে পারে।
এছাড়া, ধারা ৩৯-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি নিবন্ধন ছাড়া বন্যপ্রাণী বা তাদের অংশ সংরক্ষণ করে, তবে তার বিরুদ্ধে ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে। পুনরাবৃত্তিতে এই শাস্তি বাড়ানো হয়। ধারা ৪০ অনুযায়ী, লাইসেন্স বা পারমিটের শর্ত লঙ্ঘন করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তি প্রদানের বিধান রয়েছে।
বন্যপ্রাণী হত্যা বা পাচার সম্পর্কিত আরও কিছু আইন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী, পরিবেশের ক্ষতি করার যে কোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল রক্ষা করা সম্ভব হয়।
পাশাপাশি, বন আইন ১৯২৭-এ বলা হয়েছে, অবৈধভাবে বনের গাছ কাটা, শিকার করা বা প্রাণী ধ্বংস করা দণ্ডনীয় অপরাধ। নাগরিক দায়িত্ব শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পরিপূরক নয়, বরং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের কর্তব্য হলো, বন্যপ্রাণী হত্যা, শিকার, বা পাচারের ঘটনা প্রত্যক্ষ করলে তা দ্রুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিত করা। ব্যক্তিগতভাবে, কখনোই বন্যপ্রাণী শিকার বা তাদের দেহাংশ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত না হওয়া, এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি—বিশেষ করে শিশুদের ও পরিবারের সদস্যদের বন্যপ্রাণী রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা। নাগরিকদের আরো দায়িত্ব হচ্ছে, বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল যে মন বন, নদী বা জলাভূমি নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা।
জাতীয় পুরস্কার নীতিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হবে। এই নীতি মালার মাধ্যমে সরকারের উদ্দেশ্য হলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সম্মানিত ও উদ্যমী নাগরিকদের উৎসাহিত করা, যাতে তারা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে এবং আরও বৃহত্তর পরিসরে বন্যপ্রাণী রক্ষায় অবদান রাখতে সক্ষম হয়। নাগরিকদের এগিয়ে আসা, সচেতনতা সৃষ্টি এবং আইন মান্য করার মাধ্যমে আমরা একটি সুস্থ এবং সমৃদ্ধ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি।
বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধ দমনে কাজ করছে বন অধিদপ্তরের অধীনস্থ ‘𝗪𝗶𝗹𝗱𝗹𝗶𝗳𝗲 𝗖𝗿𝗶𝗺𝗲 𝗖𝗼𝗻𝘁𝗿𝗼𝗹 𝗨𝗻𝗶𝘁 (𝗪𝗖𝗖𝗨)’-
𝗪𝗖𝗖𝗨 এর সাথে বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধ দমনে হটলাইনে যোগাযোগ:
ইমেইল: 𝘄𝗰𝗰𝘂.𝗳𝗱@𝘆𝗮𝗵𝗼𝗼.𝗰𝗼𝗺
জরুরি ফোন নম্বরসমূহ:
+𝟴𝟴𝟬𝟭𝟵𝟵𝟬𝟬𝟬𝟬𝟬𝟵𝟱
+𝟴𝟴𝟬𝟭𝟳𝟭𝟭𝟱𝟵𝟭𝟬𝟯𝟱
+𝟴𝟴𝟬𝟭𝟵𝟭𝟲𝟬𝟵𝟱𝟲𝟰𝟯
+𝟴𝟴𝟬𝟭𝟳𝟰𝟳𝟬𝟯𝟲𝟮𝟯𝟳
+𝟴𝟴𝟬𝟭𝟲𝟭𝟳𝟴𝟲𝟴𝟲𝟯𝟲
এছাড়াও জরুরী জাতীয় সেবা 999 ও জাতীয় তথ্যসেবা 333 এবং স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা বন অফিসারের কাছে অভিযোগ দেয়া যাবে।
*লেখক: সুলতানা করিম রামিশা, সহযোগী, টিম লিগ্যাল প্রজেক্ট ম্যানেজম্যান্ট, 𝗟𝗲𝗴𝗮𝗹 𝗘𝗺𝗽𝗼𝘄𝗲𝗿𝗺𝗲𝗻𝘁 𝗕𝗮𝗻𝗴𝗹𝗮𝗱𝗲𝘀𝗵-𝗟𝗘𝗕
আরও পড়ুন- বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও প্রতিকার
