FeatureHome

বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত

কর কি?

কর হলো মূলত একটি রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রাচীনকালে রাজা/রানী কর্তৃক প্রজাদের থেকে যে খাজনা আদায় করা হতো, বর্তমান যুগে সেই খাজনা আদায়ের আধুনিক রূপই হচ্ছে কর বা ট্যাক্স। কর-কে আমরা ট্যাক্স (Tax), খাজনা (Rent) বা শুল্ক (Custom) বলেও জেনে থাকি। এটি মূলত রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত এক ধরনের চার্জ।

কর বা শুল্ক হচ্ছে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত এমন একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়, যা প্রদানযোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থার উপর আরোপ করা হয়ে থাকে। সহজ কথায়, কর হচ্ছে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারকে দেওয়া নির্দিষ্ট অর্থ যা বাধ্যতামূলক ভাবে প্রদেয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আদায়কৃত অর্থ সরকার দেশের জনগণের জন্য কল্যানমূলক কাজেই ব্যয় করে থাকেন। যেমন: শিক্ষা, চিকিৎসা,অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি।

আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ২(২১) অনুযায়ী, কর বলতে বোঝায়—এই আইনের অধীনে আরোপিত আয়কর, অতিরিক্ত কর, জরিমানা, সুদ, সারচার্জ এবং আইন অনুযায়ী আদায়যোগ্য অন্যান্য অর্থ।

 

কর আদায়ের উদ্দেশ্য

১. রাজস্ব সংগ্রহ: সরকারের প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে মূলত কর আদায় করা হয়ে থাকে, যা  সরকারি বিভিন্ন ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। যেমন: প্রশাসন পরিচালনা, প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান ইত্যাদি।

২. আয়ের পুনর্বণ্টন: ধনী থেকে গরিবের দিকে আয় স্থানান্তর করে সামাজিক বৈষম্য বা অসমতা হ্রাস করা (Progressive Tax মাধ্যমে)।

৩. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মন্দা প্রতিরোধ বা বাজেট ঘাটতি পূরণ  এবং অর্থনৈতিক চক্র স্থিতিশীল রাখা।

৪. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: বিনিয়োগ, সঞ্চয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতে সম্পদ নির্দিষ্ট পথ বা উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা।

৫. ক্ষতিকর ভোগ্যপণ্যে নিরুৎসাহিত করা: মদ, সিগারেট এবং অন্যান্য মাদক দ্রব্য ও দূষণকারী পণ্য ইত্যাদির উপর উচ্চ কর আরোপ করে সামাজিক ক্ষতি কমানো।

৬. সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন: করের মাধ্যমে সম্পদের অসম বণ্টন হ্রাস করে সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

৭. পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা: সঠিক কর ও ব্যয় নীতি একত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে পূর্ণ কর্মসংস্থানের দিকে অগ্রসর করা।

 

করদাতা কে?

বাংলাদেশে করদাতা বলতে বোঝায় সেইসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন, যাদের আয় বা সম্পদ আইন অনুযায়ী করযোগ্য সীমার মধ্যে পড়ে এবং যাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

 

যেসব আয়ের উপর কর প্রযোজ্য

বাংলাদেশের আয়কর আইন,২০২৩-এর ২(৪৫) অনুযায়ী, করযোগ্য আয় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে করদাতা আবাসিক (Resident) নাকি অনাবাসিক  (Non-Resident)এর উপর। এটি শুধু ব্যক্তির ক্ষেত্রেই নয়, বরং কোম্পানি, Hindu Undivided Family (HUF) বা হিন্দু অখণ্ড পরিবার, ফার্ম,ট্রাস্ট, অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

১. Resident ব্যক্তি (Individual Resident):

শর্ত হচ্ছে:
– যদি কোনো ব্যক্তি একটি আয়বর্ষে বাংলাদেশে ১৮৩ দিন বা তার বেশি অবস্থান করে, অথবা
– আয়বর্ষে বাংলাদেশে ৯০ দিন অবস্থান করে এবং পূর্ববর্তী গত ৪ বছরে মোট ৩৬৫ দিন অবস্থান করে, তাহলে তিনি Resident(আবাসিক) হিসেবে গণ্য হবেন।

*Resident ব্যক্তির করযোগ্য আয়:
– বাংলাদেশে অর্জিত সমস্ত আয় (যেমন:চাকুরীর বেতন, ব্যবসা, সম্পত্তি, সুদ, মূলধনী লাভ ইত্যাদি)।
– বিদেশে অর্জিত আয়ও করযোগ্য, যদি তা ঐ বছর Resident ব্যক্তির হাতে আসে বা প্রাপ্ত হয়।
অর্থাৎ, Resident ব্যক্তির Worldwide Income করযোগ্য।

২. Non-Resident ব্যক্তি (Individual Non-Resident):

শর্ত হচ্ছে :
যে ব্যক্তি উপরোক্ত ২টি শর্তের একটি পূরণ করে  না থাকেন, তবে তিনি  Non-Resident(অনাবাসিক) ব্যক্তি বলে গণ্য হবেন।

*Non-Resident ব্যক্তির করযোগ্য আয়:
– এক্ষেত্রে কেবলমাত্র বাংলাদেশে অর্জিত বা প্রাপ্ত আয় করযোগ্য বলে গণ্য হবে।
– বিদেশে অর্জিত কোনো আয় করযোগ্য হবে না।
অর্থাৎ, Non-Resident(অনাবাসিক) ব্যক্তির Bangladesh-Sourced Income করযোগ্য।

৩. কোম্পানি (Company):

ক. Resident কোম্পানি:
যদি কোনো কোম্পানির কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে থাকে, তবে সেই কোম্পানি  Resident কোম্পানি হিসেবে গণ্য হবে।
– Resident কোম্পানির করযোগ্য আয় হলো বিশ্বব্যাপী আয় (বাংলাদেশ + বিদেশ)।

খ. Non-Resident কোম্পানি:
যদি কোনো কোম্পানির কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে না থাকে, তবে সেটি Non-Resident কোম্পানি বলে গণ্য হবে।
– Non-Resident কোম্পানির করযোগ্য আয় হলো কেবলমাত্র বাংলাদেশে অর্জিত বা প্রাপ্ত আয়।

৪. Hindu Undivided Family (হিন্দু অখণ্ড পরিবার):

বাংলাদেশের আয়কর আইন,২০২৩ অনুযায়ী হিন্দু অখণ্ড পরিবার (HUF) একটি আলাদা করদাতা সত্তা হিসেবে গণ্য হয়।
*Resident HUF: যদি পরিবারপ্রধান (Karta) বা পরিবারের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে থাকে, তবে এটি Resident এবং এর করযোগ্য আয় হবে বিশ্বব্যাপী আয়।
*Non-Resident HUF: যদি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে না থাকে, তবে এটি Non-Resident এবং এর করযোগ্য আয় হবে কেবলমাত্র বাংলাদেশে অর্জিত আয়।

৫. অন্যান্য সত্তা:

*Partnership Firm, Association of Persons (AOP) , Trust,তহবিল কিংবা আলাদা কোনো সত্তা যা বাংলাদেশের বলবৎ কোনো আইন অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে বা যার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা অথবা সকল কিছু দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়েছে, তাহলে সেটিকে Resident(আবাসিক) বলেই গণ্য করা হবে।

 

Income Year (আয়কর বছর) এবং Assessment Year (ধার্য্য বছর)-সম্পর্কে :

বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ (Income Tax Act, 2023) অনুসারে, আয়কর নির্ধারণের জন্য দুটি সময়কাল ব্যবহৃত হয়:
১.Income Year (আয়বর্ষ) এবং
২. Assessment Year (মূল্যায়ন বর্ষ)।

এগুলো হচ্ছে মূলত আয়কর রিটার্ন দাখিল, কর নির্ধারণ এবং পরিশোধের ভিত্তি।

 

১. Income Year (আয়বর্ষ):

আয়বর্ষ বলতে বোঝায় সেই বর্ষ বা সময়কাল, যে সময়ে করদাতার আয় উৎপন্ন হয় বা অর্জিত হয়। অর্থাৎ, যে বছরে আয় হয়, সেটিই আয়বর্ষ (Income Year)।
*সাধারণ নিয়ম:
সাধারণত করদাতা (ব্যক্তি, ফার্ম, কোম্পানি ইত্যাদি) এর জন্য Income Year হলো ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত(যেমন: ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫)।
এটি হচ্ছে মূল্যায়ন বর্ষ বা Assessment Year-এর ঠিক আগের বর্ষ।

*বিশেষ ক্ষেত্র:
ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য Income Year বিবেচিত হয় ক্যালেন্ডার ইয়ার (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর)।
এছাড়াও নতুন ব্যবসা শুরু, ব্যবসা বন্ধ, অংশীদারিত্বে পরিবর্তন ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু নিয়ম প্রযোজ্য হয়ে থাকে।
উদাহরণ: যদি কোনো ব্যক্তির আয় ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত হয়, তাহলে এটি Income Year ২০২৪-২০২৫ বলে হলে গণ্য হবে।

 

২. Assessment Year (মূল্যায়ন বর্ষ):

মূল্যায়ন বর্ষ বলতে বোঝায় সেই বর্ষ যেখানে Income Year-এর আয়ের ওপর কর মূল্যায়ন (assessment) করা হয়, রিটার্ন দাখিল করা হয় এবং কর নির্ধারিত ও পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ, Income Year-এ যে আয় হয় সেই আয়কে এই বর্ষে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
*সাধারণ নিয়ম:
Assessment Year হলো ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১২ মাসের সময়কাল, যা Income Year-এর ঠিক পরের বর্ষ।
-এটি “Tax Year” নামেও পরিচিত।
উদাহরণ: Income Year ২০২৪-২০২৫ (১ জুলাই ২০২৪ – ৩০ জুন ২০২৫)-এর আয়ের ওপর কর মূল্যায়ন করা হবে Assessment Year ২০২৫-২০২৬ (১ জুলাই ২০২৫ – ৩০ জুন ২০২৬)-এ। রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে (ট্যাক্স ডে)।

করমুক্ত সীমা

কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান আয় করা শুরু করেছে বলেই যে সেই আয়ের উপরই কর আরোপ হবে এমনটা নয়,কর আরোপের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমাও রয়েছে। করমুক্ত সীমা হচ্ছে সেই আয়ের পরিমাণ, যার উপর কোনো আয়কর আরোপ করা হয় না। অর্থাৎ একজন করদাতার বার্ষিক আয় যদি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই থাকে, তবে তাকে আয়কর দিতে হয় না।সরকার প্রতি অর্থবছরেই একটি Tax-free threshold বা করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করে থাকেন আর সেই সীমার মধ্যে আয় হলে কর দিতে হয় না,কিন্তু সীমার বেশি আয় হলে অতিরিক্ত অংশের উপর কর ধার্য করা হয়।

-করমুক্ত সীমা নিম্নরূপ:

১. পুরুষ: সাধারণ করদাতা অর্থাৎ একজন পুরুষের বার্ষিক করমুক্ত সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা।
২. নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী: নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতার জন্য করমুক্ত সীমা হচ্ছে চার লাখ টাকা।
৩. তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বী: এই শ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত সীমা হচ্ছে  ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
৪. গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা: গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের করমুক্ত সীমা হলো ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
৫. প্রতিবন্ধী সন্তানদের পিতা–মাতা: কারও প্রতিবন্দ্বী সন্তান যদি থেকে থাকে তাহলে সেই পিতা-মাতা করদাতা হলে নিয়মিত করমুক্ত আয়সীমার পরও তারা বাড়তি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ছাড় পাবেন। এই ছাড় দেওয়া হয় মূলত সেই প্রতিবন্দ্বী সন্তানের ভরণপোষণের জন্য। তবে পিতা ও মাতা দুজনই যদি করদাতা হয়ে সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে যেকোনো একজন এই কর ছাড়ের সুবিধা পাবেন। এছাড়াও কোনো প্রতিবন্ধীর আইনানুগ অভিভাবক থেকে থাকলে এবং তিনি  করদাতা হলে তিনিও তার করমুক্ত সীমার পাশাপাশি সেই প্রতিবন্ধীর জন্য আরও বাড়তি ৫০ হাজার টাকা ছাড় পাবেন।

 

বাংলাদেশে কর আদায় কর্তৃপক্ষ

বাংলাদেশে কর (Tax) আদায়ের দায়িত্ব মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue – NBR) এর অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে। NBR-এর অধীনে বিভিন্ন বিভাগ ও অফিসের মাধ্যমেই মূলত দেশের সকল ধরনের কর আদায় করা হয়।

NBR-এর অধীনে প্রধান বিভাগসমূহ:
১. আয়কর বিভাগ (Income Tax Division)।
২. মূল্য সংযোজন কর (VAT) ও এক্সাইজ বিভাগ।
৩. কাস্টমস বিভাগ (Customs Division)।

 

করের প্রকারভেদ 

ক. Direct Tax (প্রত্যক্ষ কর)-

প্রত্যক্ষ কর হচ্ছে এমন যা সরাসরি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়, সম্পদ বা মুনাফার উপর আরোপ করা হয় এবং যা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজে সরকারকে প্রদান করে থাকেন। যেমন:

*আয়কর (Income Tax) 

আয়কর আইন,২০২৩ -এর ২(১৪) অনুযায়ী- আয়কর অর্থ উক্ত আইনের অধীনে আরোপযোগ্য বা পরিশোধযোগ্য সকল কর বা চার্জ।  আয়কর হলো সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সত্তার আয় বা লাভের উপর আরোপিত কর বা চার্জ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর যে কর ধার্য করা হয় সেটিই আয়কর। এটি সাধারণত নির্ধারিত বেতন,ব্যবসায়িক লাভ,মূলধনের উপর লাভ, সুদ,ভাড়া ইত্যাদি আয়ের উপর আরোপ করা হয়ে থাকে।

*কোম্পানি কর (Corporate Tax):

কর্পোরেট ট্যাক্স হলো কোম্পানির আয় বা লাভের (net profit) উপর সরকারের আরোপিত প্রত্যক্ষ কর। বাংলাদেশে রেসিডেন্ট কোম্পানি তাদের বিশ্বব্যাপী আয় করযোগ্য করে, আর
নন-রেসিডেন্ট কোম্পানি শুধু বাংলাদেশে অর্জিত বা প্রাপ্ত আয়ের উপর কর দেয়।
এছাড়াও Company Act,1994 অনুযায়ী গঠিত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও এক্ষেত্রে ব্যাংক, বীমা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদেশি কোম্পানি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ।
~কর্পোরেট ট্যাক্সের ধরন:
-Flat Rate Tax: নির্দিষ্ট হারে কর আরোপ।
– Progressive Tax: লাভের পরিমাণ অনুযায়ী করের হার বাড়ে।
– Sector-Specific Tax: ব্যাংক, বীমা, টেলিকম ইত্যাদি খাতে আলাদা বা বিশেষ হার প্রযোজ্য হয়।

মূলধনী লাভ কর (Capital Gains tax):

Capital Gain হলো কোনো সম্পদ (যেমন: শেয়ার, জমি, বাড়ি, যানবাহন, গহনা ইত্যাদি) বিক্রি বা হস্তান্তরের সময় বিক্রয়মূল্য এবং ক্রয়মূল্যের মধ্যে যে লাভ হয় সেই লাভ। আর এই লাভের উপর আরোপিত করকেই বলা হয় মূলধনী লাভ কর বা Capital Gains Tax।

 

খ. Indirect Tax (পরোক্ষ কর)-

পরোক্ষ কর হচ্ছে আমরা কোনো পণ্য ক্রয় বা সেবা ভোগের সময় যে কর দিয়ে থাকি, এটি  ব্যক্তি সরাসরি প্রদান করে না বরং কোনো মাধ্যমের উপর ভিত্তি করে প্রদান করে থাকে।

যেমন:

*ভ্যাট (Value Added Tax):

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী ভ্যাট (Value Added Tax) হলো একটি পরোক্ষ কর যা পণ্য ও সেবার উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ এবং বিক্রয়ের প্রতিটি ধাপে যোগ হওয়া মূল্যের উপর আরোপ করা হয়ে থাকে । শেষ ভোক্তা (ক্রেতা) এই কর পরিশোধ করে, কিন্তু ব্যবসায়ী প্রতিটি স্তরে ভ্যাট সংগ্রহ করে তা  সরকারের নিকট জমা দেয়।

 

*শুল্ক (Customs Duty):

কাস্টমস আইন, ১৯৬৯অনুযায়ী,

কাস্টমস ডিউটি হলো বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কোনো পণ্যের উপর আরোপিত শুল্ক। কাস্টমস ডিউটি শুধুমাত্র আমদানিকৃত পণ্যে লাগে, রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয় (রপ্তানিতে কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনা বা রিফান্ড দেওয়া হয়)।

 

*আবগারি শুল্ক (Excise Duty):

এক্সাইজ ডিউটি হলো দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত নির্দিষ্ট পণ্যের উপর আরোপিত একটি পরোক্ষ কর। এটি উৎপাদনের সময় বা উৎপাদনের পর বিক্রয়ের সময় আরোপ করা হয়ে থাকে। উৎপাদকই এই কর সরকারের নিকট জমা দেয়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যোগ হয়ে ভোক্তার কাছে চলে যায়।যেমন: তামাকজাত দ্রব্য, ব্যবহার্য সামগ্রী ইত্যাদি।

 

* বৈদ্যুতিক কর (Electricity Duty / Electric Energy Tax):

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং আয়কর আইন,২০২৩ অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক কর (Electricity Duty) হলো বিদ্যুৎ বিলের উপর আরোপিত এক ধরনের পরোক্ষ কর। এটি মূলত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর (গ্রাহকের) কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে এবং যা সরকারের রাজস্বে যোগ হয়। এই করের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে  বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা।

 

*সম্পূরক শুল্ক (Supplementary Duty):

কাস্টমস আইন, ১৯৬৯ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন,২০১২ অনুযায়ী, সম্পূরক শুল্ক (Supplementary Duty) হলো আমদানিকৃত পণ্যের উপর আরোপিত একটি অতিরিক্ত শুল্ক। এটি কাস্টমস ডিউটির পরে এবং ভ্যাটের আগে যোগ করা হয়। এটি শুধুমাত্র আমদানিকৃত পণ্যের উপরই প্রযোজ্য, স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের উপর নয়।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো:
-বিলাসবহুল, অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা।
-দেশীয় শিল্প সুরক্ষা দেওয়া।
-সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা।

 

গ. Local Government Tax (স্থানীয় সরকার কর):

এটি হচ্ছে স্থানীয় সরকার কর্তৃক আদায়কৃত কর, যা এলাকার উন্নয়ন ও পরিষেবা প্রদানে ব্যবহৃত হয়। যেমন:

*পৌরকর (Municipal Tax/City Corporation Tax): পৌরসভা আইন, ২০০৯ এবং সিটি কর্পোরেশন আইন,২০০৯ অনুযায়ী, পৌর কর হচ্ছে মূলত পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের অধীনে অবস্থিত সম্পত্তির মালিকদের উপর আরোপিত একটি স্থানীয় কর। এটি হোল্ডিং ট্যাক্স বা প্রপার্টি ট্যাক্স নামেও পরিচিত। এই করের অর্থ সেই পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন কাজে (রাস্তা, আলো, নর্দমা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি) ব্যয় করা হয়।

 

*বাজার ফি বা হাট কর:

বাজার ফি ও হাট কর হলো মূলত স্থানীয় সরকার (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ) কর্তৃক সাপ্তাহিক/দৈনিক বাজার বা হাটের উপর আরোপিত একটি স্থানীয় কর। যা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং স্থানীয় উন্নয়ন (হাটের রাস্তা, আলো, নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি) কাজে ব্যবহার করা হয়।

 

*ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax):

ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ১৯৫০ এবং ভূমি সংস্কার বোর্ডের নিয়মাবলী অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax বা LDT) হলো জমির মালিকদের উপর আরোপিত এক ধরনের বার্ষিক কর, যা পূর্বে খাজনা নামে পরিচিত ছিল। এই করের অর্থ ভূমি রেকর্ড সংরক্ষণ, জমির উন্নয়ন, সার্ভে ও ম্যাপিং ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

* পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি:

পৌরসভা আইন,২০০৯,  সিটি কর্পোরেশন আইন, ২০০৯ এবং ওয়াসা আইন,১৯৯৬ অনুযায়ী, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি হচ্ছে পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন বা ওয়াসা (WASA) কর্তৃক পানি সরবরাহ ও বর্জ্য (স্যুয়ারেজ/ড্রেনেজ) ব্যবস্থাপনার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা একটি ফি।

 

*ট্রেড লাইসেন্স ফি(Trade Licence fee):

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন,২০০৯ এবং মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্সেশন রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী, ট্রেড লাইসেন্স ফি হলো ব্যবসা পরিচালনার জন্য সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদকে দেওয়া একধরনের বার্ষিক ফি। এটি ব্যবসার আকার, ধরন ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে থাকে।

 

ঘ. Other Taxes or Charges (অন্যান্য কর/চার্জ):

এটি হচ্ছে মূলত বিশেষ উদ্দেশ্যে বা নির্দিষ্ট কোনো খাতে আরোপ করা এমন কর ও চার্জ।

যেমন:

*ভূমি রেজিস্ট্রেশন ফি(Land Registration Fee):

রেজিস্ট্রেশন আইন,১৯০৮ এবং স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ অনুযায়ী, ভূমি রেজিস্ট্রেশন ফি হচ্ছে মূলত জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা অন্যান্য সম্পত্তি কেনা-বেচা, হস্তান্তর, হেবা, বন্ধক বা ভাগাভাগির সময় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করার জন্য দেওয়া  আইনি ফি। এটি একটি দলিলের বৈধতা নিশ্চিত করে এবং সরকারি রেকর্ডে সংরক্ষণ করে থাকে। রেজিস্ট্রেশন ফি ছাড়া সাধারণত কোনো দলিল আইনত বৈধ হয় না।

 

*যানবাহন ও পরিবহন সংক্রান্ত ফি( Motor & Vehicle Tax):

বিআরটিএ,সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী, যানবাহন ও পরিবহন সংক্রান্ত ফি হলো গাড়ি, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক ইত্যাদি নিবন্ধন, ফিটনেস, রোড ট্যাক্স, টোল এবং অন্যান্য চার্জ যা বিআরটিএ (Bangladesh Road Transport Authority), সড়ক ও জনপথ বিভাগ বা অন্যান্য সংস্থা আদায় করে থাকেন। এগুলো মূলত যানবাহনের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা হয়।

 

*স্ট্যাম্প ডিউটি(Stamp Duty):

স্ট্যাম্প ডিউটি হলো একটি সরকারি কর (Tax) যা বিভিন্ন ধরনের নন-জুডিশিয়াল দলিল বা চুক্তিপত্র (যেমন: বিক্রয় চুক্তি, লিজ, এগ্রিমেন্ট, পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি, মর্টগেজ ইত্যাদি) তৈরি বা রেজিস্ট্রি করার সময় দেওয়া হয়ে থাকে।

*সার্ভিস চার্জ (Service Charge):

সার্ভিস চার্জ হচ্ছে মূলত একটি অতিরিক্ত ফি বা চার্জ, যা কোনো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (রেস্টুরেন্ট, হোটেল, ডেলিভারি সার্ভিস, ব্যাংক, ই-কমার্স ইত্যাদি) তাদের দেওয়া সেবার জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করে। এটি মূলত সাধারণ বিলের ওপর একটি শতাংশ হিসেবে যোগ করা হয়।

 

কর প্রদানের প্রক্রিয়া:

বাংলাদেশে কর প্রদানের প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ ও আধুনিক হয়েছে। অনলাইন পোর্টাল, ব্যাংক চালান এবং ডিজিটাল সেবা ইত্যাদি ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই কর দিতে পারছে। এনবিআরের অনলাইন পোর্টাল- https://etaxnbr.gov.bd/

-কর প্রদানের ধাপসমূহ

১. করযোগ্যতা নির্ধারণ:
বার্ষিক আয় যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) নির্ধারিত সীমার বেশি হয়, তবে আয়কর দিতে হবে। চাকরি, ব্যবসা, পেশা বা অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়ের ভিত্তিতে করের হার নির্ধারিত হয়।

২. কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) সংগ্রহ:
কর প্রদানের জন্য প্রথমে e-TIN (Electronic Tax Identification Number) নিতে হয়।
NBR ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে সহজেই TIN পাওয়া যায়।

৩. আয়কর রিটার্ন জমা:
প্রতি অর্থবছরে করদাতাকে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। রিটার্নে আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের সকল হিসাব উল্লেখ করতে হয়।
রিটার্ন জমা দেওয়ার মাধ্যম:
-অনলাইনে (e-Return System)।
– ম্যানুয়ালি কর অফিসে ।

৪. কর পরিশোধের উপায়:
*অনলাইন পেমেন্ট:
-NBR-Sonali Bank Tax Portal ব্যবহার করে আয়কর, VAT, কাস্টমস ডিউটি ইত্যাদি পরিশোধ করা যায়।
– ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করেও করা যায়।
*ম্যানুয়াল পেমেন্ট:
– নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় গিয়ে চালান ফরম পূরণ করে কর জমা দিতে হয়।
– ব্যাংক থেকে চালানের রসিদ সংগ্রহ করতে হয়।

 

কর প্রদানের সুযোগ-সুবিধা:

১.রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন – করের অর্থ দিয়ে সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, স্কুলসহ জাতীয় অবকাঠামো নির্মাণ হয়।
২.আইনগত দায়িত্ব পালন – কর প্রদান নাগরিকের আইনগত ও সামাজিক দায়িত্ব পূরণ করে।
৩.ভিসা সুবিধা – নিয়মিত করদাতা হলে বিদেশে ভিসা পাওয়া সহজ হয়।
৪.ব্যাংক লোন – করদাতা হিসেবে পরিচয় থাকলে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া সহজ হয়।
৫.সরকারি টেন্ডার – সরকারি টেন্ডার ও ব্যবসায়িক অনুমোদন পেতে করদাতা হওয়া বাধ্যতামূলক।
৬.সামাজিক মর্যাদা – করদাতা হিসেবে সমাজে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
৭.জরিমানা থেকে মুক্তি – সময়মতো কর দিলে জরিমানা ও শাস্তি এড়ানো যায়।
৮.ডিজিটাল সুবিধা – অনলাইনে সহজে কর প্রদানের মাধ্যমে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হয়।

 

করদাতার অধিকার ও কর্তৃপক্ষের কর্তব্য

*করদাতার অধিকার:

করদাতারা আইন অনুযায়ী কিছু মৌলিক অধিকার ভোগ করে থাকেন,যা তাদের সুরক্ষা ও সুবিধা নিশ্চিত করে।যেমন:

১.ন্যায্য আচরণের অধিকার – করদাতাকে সম্মান ও ন্যায্যতার সাথে আচরণ করতে হবে।
২.তথ্য জানার অধিকার – করদাতার কর সংক্রান্ত সকল আইন,বিধি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
৩.গোপনীয়তার অধিকার – করদাতার ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য গোপন রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
৪.আপিল করার অধিকার – কর নির্ধারণে অসন্তুষ্ট হলে করদাতা আপিল করতে পারেন।
৫.সহজ সেবা পাওয়ার অধিকার – কর প্রদানের জন্য অনলাইন ও অফলাইন উভয় সুবিধা ব্যবহার করার করদাতার অধিকার রয়েছে।
৬.সময়সীমা জানার অধিকার – করদাতার কর রিটার্ন জমা ও কর প্রদানের নির্দিষ্ট সময়সীমা জানার অধিকার রয়েছে।
৭.জরিমানা সম্পর্কে অবগত হওয়ার অধিকার – কর না দিলে কী ধরনের জরিমানা বা শাস্তি হবে তা করদাতার জানার অধিকার রয়েছে।
৮.সুবিধা ভোগের অধিকার – নিয়মিত করদাতা হিসেবে ব্যাংক লোন, ভিসা, সরকারি অনুমোদন ইত্যাদি সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

 

কর্তৃপক্ষের কর্তব্য:

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কিছু মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে, যা করদাতাদের প্রতি পালন করতে হয়। যেমন:

১.কর সংগ্রহের দায়িত্ব – আইন অনুযায়ী সঠিকভাবে কর আদায় করা।
২. তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব – করদাতাকে স্পষ্ট ও সহজভাবে কর সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা।
৩. গোপনীয়তা রক্ষা – করদাতার ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য গোপন রাখা।
৪.সহজ সেবা প্রদান – অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে কর প্রদানের সুবিধা নিশ্চিত করা।
৫.ন্যায্য আচরণ – করদাতার সাথে ভদ্র ও ন্যায্য আচরণ করা।
৬.আপিল প্রক্রিয়া পরিচালনা – করদাতার আপিল সঠিকভাবে শুনানি ও নিষ্পত্তি করা।
৭.সময়সীমা ঘোষণা – কর প্রদানের সময়সীমা ও নিয়মাবলী স্পষ্টভাবে জানানো।
৮.সচেতনতা বৃদ্ধি – করদাতাদের কর প্রদানের গুরুত্ব ও সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা।

 

শাস্তি ও জরিমানা

বাংলাদেশ আয়কর আইন,২০২৩ এর ধারা ২৬৬ থেকে ২৭৯ পর্যন্ত ধারাগুলোতে মূলত শাস্তি ও জরিমানা বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এগুলোতে কর রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা, তথ্য গোপন, ভুল তথ্য প্রদান, সার্টিফিকেট না দেওয়া, কর ফাঁকি, ও অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট জরিমানা ও শাস্তি ধার্য করা হয়েছে।

*ধারা ২৬৬ থেকে ২৭৯ (শাস্তি ও জরিমানা):
১. ধারা ২৬৬ — রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা:
রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা = করের ১০%  -ন্যূনতম জরিমানা = ১,০০০ টাকা।
– প্রতিদিন বিলম্বে = ৫০ টাকা।
– সীমা: নতুন করদাতা সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা এবং পুরনো করদাতা সর্বশেষ করের ৫০% বা ১,০০০ টাকা (যেটি বেশি হবে সেটিই ধরা হবে)।

২. ধারা ২৬৭—বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ না করলে জরিমানা:
করদাতাকে আইনের বিধি অনুসারে হিসাবের বই, রেজিস্টার বা রেকর্ড রাখতে হবে,ব্যর্থ হলে জরিমানা=
-মোট প্রদেয় করের অনধিক দেড়গুণ।
-আয় যদি করমুক্ত সীমার মধ্যে হয় তাহলে=৫০০০টাকা।
-প্রদেয় করের ৫০% বা ৫০০০ টাকা (যেটি বেশি হবে সেটিই গণ্য করা হবে)।[ধারা-৭২(৩)]

৩. ধারা ২৬৮—জাল করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর(TIN) ব্যবহার করলে:
অনধিক ২০হাজার টাকা অর্থদণ্ড।

৪. ধারা ২৬৯—অগ্রিম কর,ইত্যাদি পরিশোধে ব্যর্থতা:

৫. ধারা ২৭০—নোটিশ অমান্য:
জরিমানা= এমন অর্থদন্ড যা তার মোট আরোপযোগ্য কর বা তার কম(বেশি হবেনা)।

৬. ধারা ২৭১— কর পরিশোধে ব্যর্থতা(রিটার্নের ভিত্তিতে):
জরিমানা = মোট করের অনধিক ২৫% বা তার সমপরিমাণ অর্থ।

৭. ধারা ২৭২— আয় গোপন করলে:
আয় গোপন করে রিটার্ন দাখিল বা ভুয়া তথ্য দিলে
জরিমানা = গোপনীয় আয়ের সমপরিমাণ বা ২৫% থেকে ১০০% জরিমানা, এবং ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

৮. ধারা ২৭৩—চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট কর্তৃক জাল নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়ন:
জরিমানা= সর্বনিম্ন ৫০হাজার এবং সর্বোচ্চ ২লক্ষ টাকা।

৯. ধারা ২৭৪—জাল নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল :
জরিমানা = ১লক্ষ টাকা।

১০. ধারা ২৭৫—কর পরিশোধে খেলাপি হওয়া:
জরিমানা = বকেয়া করের অতিরিক্ত অর্থ যা তার মোট বকেয়া করের বেশি হবেনা এমন।

১১. ধারা ২৭৬—(ধারা ২৩৫)-এর বিধান পরিপালন না করা :
জরিমানা= সেই ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত আন্তর্জাতিক লেনদেনের মূল্যমানের অনধিক ১%(এক শতাংশ)।
(বি:দ্র: ২৮১ ধারা অনুযায়ী পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারের অনুমোদন বাধ্যতামূল)।

১২. ধারা ২৭৭—(ধারা ২৩৭)- এর বিধান পরিপালন না করা :
জরিমানা= সেই ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত আন্তর্জাতিক লেনদেনের মূল্যমানের অনধিক ১%(এক শতাংশ)।
(বি:দ্র: ২৮১ ধারা অনুযায়ী পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারের অনুমোদন বাধ্যতামূল)।

১৩. ধারা ২৭৮—(ধারা ২৩৮)- এর বিধান পরিপালন না করা:
জরিমানা= সেই ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত আন্তর্জাতিক লেনদেনের মূল্যমানের অনধিক ২%(দুই শতাংশ)।
(বি:দ্র: ২৮১ ধারা অনুযায়ী পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারের অনুমোদন বাধ্যতামূল)।

১৪. ধারা ২৭৯—(ধারা ২৩৯)- এর বিধান পরিপালন না করা:
জরিমানা = অনধিক ৩ লক্ষ টাকা।
(বি:দ্র: ২৮১ ধারা অনুযায়ী পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারের অনুমোদন বাধ্যতামূল)।

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করদাতাদের সুবিধার্থে হটলাইন নম্বর চালু করেছে। 

ভ্যাট হেল্প ডেস্ক- 16555
ইনকাম ট্যাক্স হেল্প ডেস্ক- 333
এক্সপোর্ট ইমপোর্ট হেল্প ডেস্ক- 16139
ই-রিটার্ন হেল্প ডেস্ক- 09643-717171
মূল ওয়েবসাইট- https://nbr.gov.bd/

 

*লেখক- সেলিনা আক্তার সুইটি: রিসার্চ এক্সিকিউটিভ, জুরিস্টিকো।

 

 

আরও পড়ুন- আয়কর আইনজীবীর যোগ্যতা দায়দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধা

 

You cannot copy content of this page