মানবাধিকার দিবসের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
মানবাধিকার কি?-মানবাধিকার হলো এমন এক অধিকার যা সার্বজনীন অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্য নয় বরং দেশের সকল নাগরিকদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য অধিকার, যা লঙ্ঘন করা আইনত অপরাধ এবং এ অধিকার মানুষের জন্মের সাথে সাথে সৃষ্টি হয়।
১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। ১৯৮৪ সালের এ দিনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে এ দিনকে অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) অনুযায়ী মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত অধিকারগুলো হলো-
-নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার
– জীবনের অধিকার
– শিক্ষার অধিকার
– সুচিকিৎসার লাভের অধিকার
– ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মুক্তির অধিকার
– আইনের চোখে সমতার অধিকার
– বাক স্বাধীনতা,ধর্মের স্বাধীনতা, চলাচলের স্বাধীনতা
– ভোট প্রদানের অধিকার, ক্ষমতায় অংশগ্রহনের অধিকার
– মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাবার অধিকার
– অর্থনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার
– বিশেষ অধিকার, যেমন: শিশু ও নারীর অধিকার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার, আদিবাসীদের অধিকার, উন্নয়নের অধিকার, নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের অধিকার ইত্যাদি।
বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে জাতিসংঘ ঘোষিত এসমস্ত মানবাধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যা দেশের মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কাজ করছে।
UDHR ঘোষিত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অঙ্গসংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাই-কমিশনার অফিস (The UN High Commissioner for Human Rights-OHCHR) বা সংক্ষেপে জাতিসংঘ মানবাধিকার (UN Human Rights)। UN Human Rights বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য নানান ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
UDHR অর্থাৎ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র এর মূল লক্ষ্য হলো- জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সাম্যতা বজায় রাখা, সম-অধিকার নিশ্চিত করা, সম-আইন নিশ্চিত করা।
কিন্তু সত্যিই কি সকলের মানবাধিকার সমভাবে সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে? OHCHR অথবা NHRC মানবাধিকার সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে পারছে?
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার সঠিক ভাবে নিশ্চিত হলেও, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে দেখা যায়।
– আঞ্চলিক যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
– গা*জায় মানুষের উপর হামলা, বোমা নিক্ষেপ ইত্যাদি কারণে হাজারো শিশু, মানুষজন মারা গিয়েছে তখন কোথায় তাদের জীবনের অধিকার বা বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা পেল!
– ফি*লি*স্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস করা, জোরপূর্বক ঘরছাড়া করা, আহত মানুষকে চিকিৎসা না দেওয়া, হাসপাতাল ধ্বংস, ওষুধ সঙ্কট, স্কুল ধ্বংস, শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা,স্বাধীন চলাচলের অধিকার লঙ্ঘন।
তখন কোথায় সেই মানবাধিকার! মানবাধিকারের সংস্থাগুলোর দায়িত্ব তখন কেন চোখে পড়ে না!
– মানুষের বাক স্বাধীনতা নাকি রয়েছে, কিন্তু কোথায়? যখন দেখি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ন্যায্য দাবী পর্যন্ত সাধারণ মানুষ করতে পারে না।
– পুলিশ বা রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলোর সাদা পোশাকে ওঠিয়ে নেয়া, বেআইনি আটক করা, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা, গুম করা, আদালতে রাজনৈতিক কারণে ন্যায্য বিচার না পাওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানবাধিকার কোথায়?
– মত প্রকাশের নাকি স্বাধীনতা রয়েছে! সংবাদিককে হুমকি দেওয়, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের জন্য গ্রেফতার করা। তখন কোথায় থাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা!
মানবাধিকার সকলেরই আছে। প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসও পালন করা হয় কিন্তু সঠিক ভাবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ অধিকার নিশ্চিত করতে পারেছে বলে মনে হয় না।
সকলের মানবাধিকার সুরক্ষা ও মানবাধিকার উন্নয়নে তাই অত্যাবশ্যক কাজ হলো-
-UDHR এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তি ও প্রণীত আইনগুলো কঠোর ভাবে বাস্তবায়ন করা
– মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে যথাযথ ভাবে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা
– মানবাধিকার বিষয়ে জন সচেতনতা বৃদ্ধি করা
– গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখা
– স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা
– রাজনৈতিক চাপমুক্ত পরিবেশ
– সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা
– সবার জন্য সমআইন নিশ্চিত করা।
*লেখক: ইশরাত জাহান রিয়া: সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, জুরিস্টিকো।
