HomeLaw News

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন

১৯৯৯ সালের মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর দীর্ঘ ২৬ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণ নিশ্চিত হলো। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর, ২০২৫) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়েছে। এই উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার পথে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ (সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদসংলগ্ন)-এর দ্বিতীয় তলায় সচিবালয়ের কার্যালয় উদ্বোধন করেন। আপাতত দুটি কক্ষে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। এছাড়া আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ, আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব এবং দেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এই মুহূর্তটিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সহযোগিতা ও সকল অংশীজনের (স্টেকহোল্ডার) সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সচিবালয়টি বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

প্রধান বিচারপতি ভবিষ্যতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “এটার সাফল্য আমাদের যতটা অর্জন হবে, এটার ব্যর্থতাও কিন্তু আমাদেরকে মেনে নিতে হবে।” তিনি বলেন, বিচারকার্য পরিচালনা এবং বিচার ব্যবস্থা পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা এখন সুপ্রিম কোর্টের কাছে কেন্দ্রীভূত (Concentrated) হয়েছে।

তিনি আগামী নির্বাচিত সরকার ও সকল অংশীজনের প্রতি আহ্বান জানান, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র বজায় রাখার স্বার্থে এই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ধারাবাহিকতা যেন অটল ও অটুট থাকে। তিনি গণমাধ্যমকে ‘ফোর্থ স্টেট’ (চতুর্থ স্তম্ভ) হিসেবে অভিহিত করে তাদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই দিনটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ‘ঐতিহাসিক দিন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ফলে অধস্তন আদালতে আর রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আগে আপনারা সব সময় শুনতেন যে অধস্তন আদালত (ট্রায়াল কোর্ট) সেগুলোর ওপর রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রীরা, বিশেষ করে আইনমন্ত্রীরা অনেক ধরনের খবরদারিত্ব করতেন। কে জামিন পাবে, কী রায় হবে, বিচারকদের পোস্টিং, পদোন্নতি, বদলি—এই সমস্ত কিছু রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন আর এ রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না।”

তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে এই সচিবালয়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট আর্থিক স্বাধীনতাও পেয়েছে।

সচিবালয়ের আইনি প্রশাসনিক ভিত্তি

পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারির মাধ্যমে।

  • ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেনের মামলার প্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়।
  • অধ্যাদেশের অনুমোদন: গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এই অধ্যাদেশের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
  • অধ্যাদেশ জারি: গত ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। এর মধ্য দিয়ে ২৫ বছর পর বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি পৃথক হলো।
  • সাংবিধানিক উদ্দেশ্য: সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য (হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক অধঃস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ) যথাযথভাবে পালনের জন্য এই স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য ছিল।

সচিবালয়ের নতুন ক্ষমতা কার্যক্রম

এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ফলে বিচার বিভাগ দ্বৈত শাসন বা দ্বৈত প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেল।

  • দায়িত্ব: সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এখন থেকে অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে।
  • কর্মকর্তা-কর্মচারী: সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে ৪৮৯টি পদ সৃজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে (৭ ডিসেম্বর ২০২৫)।
  • প্রশাসনিক প্রধান: সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির ওপর, এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
  • বিচারকদের ক্ষমতা: অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটি এবং নিয়োগ সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত এখন থেকে সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গ্রহণ করবে।
  • কমিটি গঠন: কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রধান বিচারপতি ইতিমধ্যে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘পরিকল্পনা ও উন্নয়ন’ কমিটি এবং একটি ‘পদ সৃজন’ কমিটি গঠন করেছেন।

 

আরও পড়ুন- সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়ের দায়-দায়িত্ব ও কার্যাবলি

 

You cannot copy content of this page