চেক এন্ড ব্যালেন্স কি?
চেক এন্ড ব্যালেন্স (checks and balances) হলো একটি রাষ্ট্রীয় নীতি যা সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে, যাতে কোনো একটি বিভাগ অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্জন করে অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। এর মূল অর্থ হলো ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ, যা ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ (separation of powers) নীতির সাথে যুক্ত। সাধারণত, এই নীতি সাংবিধানিক সরকার ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ত্রি-বিভাগীয় সরকার ব্যস্থায় (tripartite system), যেখানে আইন (legislative), নির্বাহী (executive) এবং বিচার (judicial) শাখাগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বিভক্ত করা হয়। এই ব্যবস্থা ভুল সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, অসদাচরণ এবং কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ঝুঁকি কমায়।
চেক এন্ড ব্যালেন্স নীতির উৎপত্তি প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ পলিবিয়াসের (Polybius) রোমান মিক্সড কনস্টিটিউশন (mixed constitution) থেকে, যা মোনার্কি (monarchy), অ্যারিস্টোক্র্যাসি (aristocracy) এবং ডেমোক্রেসি (democracy) এর সংমিশ্রণে গঠিত। পরবর্তীতে ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু (Montesquieu) এবং ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোনের লেখায় বিকশিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতাদের (framers) প্রভাবিত করে। উদ্দেশ্য হলো টায়রানি (tyranny) প্রতিরোধ করা এবং স্বাধীনতা রক্ষা করা, যেমন জন অ্যাডামস (John Adams) বলেছেন যে এটি ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণকে মডিফাই করে শাখাগুলোকে পরস্পরের উপর ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। ল্যাটিন প্রবাদ “Ubi potestas est, ibi responsabilita esse debet” (Where there is power, there must be responsibility.) অর্থাৎ, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে দায়বদ্ধতাও থাকতে হবে। এই নীতি অনুযায়ী, ক্ষমতা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্যবস্থায় চেক এন্ড ব্যালেন্সের উদাহরণ দেখা যায় যেখানে লেজিসলেটিভ শাখা (Congress) আইন তৈরি করে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট (executive) ভেটো (veto) দিতে পারেন, যা কংগ্রেস দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে ওভাররাইড (override) করতে পারে। জুডিশিয়াল শাখা (Supreme Court) আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করতে পারে, যেমন জুডিশিয়াল রিভিউ (judicial review)। প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ করেন, কিন্তু সেনেট (Senate) অনুমোদন করে; কংগ্রেস ইমপিচমেন্ট (impeachment) প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট বা বিচারককে অপসারণ করতে পারে। এছাড়া, নির্বাহী আদেশ সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা বাতিল হতে পারে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যেন কোনো শাখা এককভাবে প্রভাবশালী না হয়।
যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো সংসদীয় ব্যবস্থায় চেক এন্ড ব্যালেন্স কিছুটা ভিন্ন, যেমন আইন বিভাগ নির্বাহী বিভাগকে অনাস্থা ভোট (no-confidence vote) দিয়ে অপসারণ করতে পারে, কিন্তু আদালত আইনের সাংবিধানিকতা পর্যালোচনা করে। জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদ (General Assembly) পরস্পরকে চেক করে, যাতে ভেটো পাওয়ার (veto power) এর মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশে চেক এন্ড ব্যালেন্স সংবিধানে উল্লেখিত হলেও বাস্তবে নির্বাহী বিভাগের প্রধানের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, যা বিভাগগুলোর স্বতন্ত্রীকরণ নীতিকে দুর্বল করে। উদাহরণস্বরূপ, সংসদ (Parliament) সরকারের রাবার স্ট্যাম্প হয়ে যায় এবং বিচার বিভাগে (judiciary) নিয়োগ নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে, ফলে ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে দেখায় যে চেক এন্ড ব্যালেন্সের অভাবে দুর্নীতি, অধিকার লঙ্ঘন এবং অসাম্য বাড়তে পারে, যা ‘আইনের শাসন’ (rule of law) কে দুর্বল করে। তাই, এই নীতি শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব প্রয়োগে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
গ্রন্থণা: ওয়াজেদ নবী, এডিটর, জুরিস্টিকো।
আরও পড়ুন- জিজিয়া কর কি?
