HomeLaw News

৩ মাসের মধ্যে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাস্তবায়নের নির্দেশ হাইকোর্টের

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (০৭ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছে।

১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচার বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃংঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।

 

বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন।

উক্ত রায়ে সরকারকে নির্দেশ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব অনুযায়ী ৩ মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন ও পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন করতে হবে।

এর আগে গত ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় ৩ মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট।

রিটকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, এই রায়ের ফলে নিম্ন (অধস্তন)  আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকবে; রাষ্ট্রপতির উপর নয়। আদালত পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ রায়ে।

 

পঞ্চদশ সংশোধনীর বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করে থাকেন।

 

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।

 

১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। একইভাবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো।

 

সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের নজির অনুসারে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, সে রকম স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিভাইভ (পুনরুজ্জীবিত) ও সংবিধানে পুনর্বহাল হবে। এই আদালতের রায়ের দিন থেকে এটি কার্যকর হবে।

 

এ ছাড়া ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

 

এর আগে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট রিট দায়ের করা হয়।

হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয়। উক্ত অধ্যাদেশে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হয়েছে।

 

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অধ্যাদেশের চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

 

পরে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। তিনি বলেন, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার শেষ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেনসহ অন্যরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন। ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়। প্রায় ২৬ বছর পর সে রায়ের বাস্তবায়নে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের পথে এগোলো সরকার।

 

You cannot copy content of this page