বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ১০টি অপরাধ ও শাস্তি
দণ্ডবিধি ১৮৬০ উপমহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি আইন, যাতে বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। সমাজে গুরুতর ও নৃশংস অপরাধ প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দণ্ডবিধিতে বিভিন্ন ধরনের দণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। এই আলোচনায় দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে এমন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংক্ষেপে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হবে।
দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা -১২১, ১৩২, ১৯৪,৩০২,৩০৫,৩০৭, ৩৬৪ক,৩৬৭,৩৭৬,৩৯৬- এ সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিস্তারিত :-
ধারা ১২১:- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
যে ব্যক্তি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, অথবা যুদ্ধ চালায়, অথবা যুদ্ধ ঘোষণা/চালাতে সহায়তা করে, সে ধারা ১২১ অনুযায়ী অপরাধী।
শাস্তি:-রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা সহায়তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং এর সাথে অর্থদণ্ডও হতে পারে।
ধরা ১৩২:- রাষ্ট্র বিরোধী বিদ্রোহে সহায়তা
যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে কাউকে সহায়তা, সাহায্য, প্ররোচনা বা সুবিধা প্রদান করে, তাহলে সে এই ধারায় অপরাধী হবে।এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধ শুরু হওয়া বাধ্যতামূলক নয় যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সহায়তাই অপরাধ। যেমন অস্ত্র বা গোলাবারুদ দেওয়া আশ্রয় দেওয়া,গোপন তথ্য সরবরাহ, লোক জোগাড় করা।
শাস্তি: ধারা ১৩২ অনুযায়ী রাষ্ট্র বিরোধী বিদ্রোহে সহায়তা অপরাধের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।
ধারা ১৯৪:- মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার কারণে নির্দোষ ব্যক্তির মৃতুদন্ড হলে
যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় বা মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করে, এবং সেই মিথ্যা সাক্ষ্য বা প্রমাণের ফলে কোনো নির্দোষ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তাহলে মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা ব্যক্তি ধারা ১৯৪ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধী হবেন।
শাস্তি:-মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার কারণে নির্দোষ ব্যক্তির মৃতুদন্ড হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।
৩০২:- হত্যা
দণ্ডবিধির ধারা ৩০২ অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ও অবৈধভাবে অন্য একন মানুষের মৃত্যু ঘটায়,এবং সেই কাজটি ধারা ৩০০ অনুযায়ী ‘হত্যা (Murder)’ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে অপরাধী ধারা ৩০২-এর অধীনে দণ্ডনীয় হবে।
শাস্তি:- হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।
ধারা ৩০৩– যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীর দ্বারা হত্যা
দণ্ডবিধির ধারা ৩০৩ অনুযায়ী:-যদি কোনো ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত অবস্থায় থাকাকালীন হত্যা করে,তাহলে সে ধারা ৩০৩-এর অধীনে অপরাধী হবে।
শাস্তি:-যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীর দ্বারা হত্যাকান্ড সংঘটিত হলে তার শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ড। এই ধারায় যাবজ্জীবন বা অন্য কোনো বিকল্প শাস্তি নেই।
ধারা ৩০৫:-পাগল উন্মাদ, অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক কে আত্মহত্যার প্ররোচনা
যদি কোনো ব্যক্তি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু, অথবা উন্মাদ (পাগল), অথবা মাদকাসক্ত বোধশক্তিহীন ব্যক্তিকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা দেয়, এবং সেই ব্যক্তি আত্মহত্যা করে,তাহলে প্ররোচনাদানকারী ব্যক্তি ধারা ৩০৫ অনুযায়ী অপরাধী হবে।
শাস্তি: এই ধারায় শাস্তি—মৃত্যুদণ্ড, অথবাযাবজ্জীবন কারাদণ্ড, অথবা কারাদণ্ড (যেকোনো মেয়াদ),এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।
ধারা ৩৯৪ (এ) :- বিপদজনক অস্ত্র ও এসিড নিক্ষেপ এর মধ্যমে মৃত্যু ঘটালে
যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বিপজ্জনক অস্ত্র বা উপায়ে (যেমন—ছুরি, তলোয়ার, আগ্নেয়াস্ত্র, আগুন, গরম পদার্থ, বিষ, অ্যাসিড ইত্যাদি) ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিকে মৃত্যু ঘটায় তাহলে সে ধারা ৩২৬ অনুযায়ী অপরাধী হবে।
শাস্তি :- মৃত্যুদণ্ড, অথবাযাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।
ধারা ৩৭৬(ক) ধর্ষণ এর ফলে বড় কোন ক্ষতি বা মৃত্যু হলে
দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৬ অনুযায়ী যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য একজন ব্যক্তিকে ধর্ষণ (Rape) করে,তাহলে সে ধারা ৩৭৬-এর অধীনে অপরাধী হবে।
শাস্তি- ধর্ষণের ফলে মৃত্যু বা স্থায়ী ক্ষতি হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হবে।
৩৯৬ এর (ক):- ডাকাতির সময় হত্যা
যদি কেউ ডাকাতির (Dacoity) সময় কেউ হত্যা করে, তাহলে তাকে ধারা ৩৯৬-এর অধীনে দণ্ডনীয় ধরা হয়।
শাস্তি:-মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং প্রয়োজনে অর্থদণ্ড হবে।
ধারা ৩৬৪:- অপহরণের ফলে মৃত্যু
দণ্ডবিধির ধারা ৩৬৪ অনুযায়ী— যদি কেউ অপরাধী উদ্দেশ্যে অপহরণ (Kidnapping) করে এবং ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটে, তাহলে সে ধারা ৩৬৪-এর অধীনে অপরাধী হবে।
শাস্তি:-মৃত্যুদণ্ড, অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং প্রয়োজনে অর্থদণ্ড।
*লেখক: আল জিহাদ উৎসব: আইনের শিক্ষার্থী।
আরও পড়ুন- বাংলাদেশে প্রাণি সুরক্ষা আইন
