FeatureHomeIntl Law

ইন্টারপোল প্রতিষ্ঠা গঠন দায়-দায়িত্ব ও কার্যাবলি

ইন্টারপোল (INTERPOL), আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সংস্থা (International Criminal Police Organization) ১৯২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ কমিশন (ICPC) নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্টারপোল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপরাধ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।

১৯১৪ সালের মোনাকোতে অনুষ্ঠিত ১ম আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সম্মেলন এবং ১৯২২ সালের নিউ ইয়র্কের সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে। অস্ট্রিয়ান পুলিশ কর্মকর্তা (যিনি পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী) জোহান শোবারের নেতৃত্বে ২২টি দেশের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন এবং প্রাথমিকভাবে মুদ্রা জালিয়াতি, অপরাধীদের সনাক্তকরণ এবং অপরাধের তথ্য বিনিময়ের উপর জোর দেওয়া হয়।

১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানির অস্ট্রিয়া দখলের পর ইন্টারপোল নাৎসি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধকালে তার কার্যক্রম প্রায় স্থগিত হয়ে পড়ে, তখন ইন্টারপোলের নেতৃত্বে ছিলেন রাইনহার্ড হাইড্রিখের মতো নাৎসি কর্মকর্তারা। যুদ্ধোত্তর ১৯৪৬ সালে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের উদ্যোগে পুনরুজ্জীবিত হয়। সদর দপ্তর প্যারিসে স্থানান্তর করা হয় এবং ১৯৫৬ সালে নতুন সংবিধান গ্রহণ করে নাম পরিবর্তন করে ইন্টারপোল করা হয়, নামটি সংস্থার টেলিগ্রাফিক ঠিকানা থেকে উদ্ভূত। ১৯৮৯ সালে সদর দপ্তর ফ্রান্সের লিওঁতে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে ১৯৬টি সদস্য দেশ নিয়ে ইন্টারপোল জাতিসংঘের পর ২য় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে।

 

ইন্টারপোলের সাংগঠনিক কাঠামো ও গঠন

ইন্টারপোলের প্রাতিষ্ঠানিক (সাংগঠনিক) কাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং সদস্যভিত্তিক, যা সংস্থার সংবিধান এবং সাধারণ বিধিবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অঙ্গ হলো সাধারণ পরিষদ (General Assembly), যেখানে প্রত্যেক সদস্য দেশের একজন প্রতিনিধি থাকেন। সাধারণ পরিষদ বছরে একবার মিলিত হয়ে নীতি নির্ধারণ করে, নির্বাহী কমিটি এবং সভাপতি নির্বাচন করে। নির্বাহী কমিটিতে ১৩ জন সদস্য থাকেন, যারা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেন, এবং এই কমিটি সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করেন।

দৈনন্দিন কার্যপরিচালনার দায়িত্বে থাকেন মহাসচিব (Secretary General), যিনি ৫ বছরের মেয়াদে নিযুক্ত হন এবং লিওঁর সদর দপ্তরে প্রায় ১,০৫০ জন কর্মচারী (পুলিশ এবং সিভিলিয়ান) নিয়ে কাজ করেন। প্রত্যেক সদস্য দেশে একটি জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো (National Central Bureau – NCB) রয়েছে, যা ইন্টারপোলের সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। এছাড়াও বিশ্বজুড়ে ৭টি আঞ্চলিক ব্যুরো এবং বিশেষ প্রতিনিধি অফিস রয়েছে, যেমন সিঙ্গাপুরে ইন্টারপোল গ্লোবাল কমপ্লেক্স ফর ইনোভেশন (IGCI), যা ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় কেন্দ্রীভূত। সংস্থার বাজেট প্রায় ১৭৬ মিলিয়ন ইউরো (২০২৩ সালে প্রকাশিত তথ্যানুসারে), যা সদস্য দেশগুলির চাঁদা এবং স্বেচ্ছাসেবী অনুদান থেকে আসে। ইন্টারপোল চারটি ভাষায় (আরবি, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ) দাফতরিক কাজ সম্পন্ন করে।

২০২৫ সাল থেকে ইন্টারপোলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ফ্রান্সের লুকাস ফিলিপ, আর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ব্রাজিলের ভালডেসি উরকিজা।

 

ইন্টারপোলের দায়-দায়িত্ব, ক্ষমতা ও কার্যাবলী

ইন্টারপোলের দায়-দায়িত্ব, ক্ষমতা ও কার্যাবলী মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলির পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করা, যা সংস্থার সংবিধানের ২ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখিত রয়েছে। এর কোনো গ্রেপ্তারি ক্ষমতা নেই, বরং তথ্য বিনিময় এবং সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যাতে সদস্য দেশগুলির অভ্যন্তরীণ আইন এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রকে সামনে রাখা হয়। মূল কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে অপরাধীদের তথ্য ভাগ করে নেয়া, যেমন আঙ্গুলের ছাপ, ডিএনএ, ছবি এবং চুরি হওয়া নথিপত্রের ডাটাবেস রক্ষণাবেক্ষণ; I-24/7 নামক সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তথ্য প্রদান; এবং ৮ ধরনের নোটিশ জারি করা, যার মধ্যে রেড নোটিশ (অপরাধীদের গ্রেপ্তারের অনুরোধ), ইয়েলো নোটিশ (নিখোঁজ ব্যক্তি), ব্লু নোটিশ (তথ্য সংগ্রহ), গ্রিন নোটিশ (সতর্কতা), অরেঞ্জ নোটিশ (বিপজ্জনক আইটেম) এবং সিলভার নোটিশ (চুরি হওয়া সম্পদের জন্য) উল্লেখযোগ্য। ইন্টারপোল সন্ত্রাসবাদ, সাইবার অপরাধ, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, পরিবেশ অপরাধ, দুর্নীতি এবং সংগঠিত অপরাধের মতো আন্তরাষ্ট্রীয় অপরাধ মোকাবিলায় যৌথ অভিযান সমন্বয়, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (IRT) পাঠায়।

ইন্টারপোল জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতায় সন্ত্রাসবাদীদের তালিকা প্রস্তত করে এবং সাতটি গ্লোবাল পুলিসিং গোলস (যেমন অপরাধী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা) অনুসরণ করে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এছাড়াও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইন্টারপোলের কারিগরি ও তথ্যগত সহায়তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউরোপোলসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার সাথেও ইন্টারপোল সমন্বয় করে কাজ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

 

ইন্টারপোলের দুর্বলতা ও সমালোচনা

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে স্বৈরাচারী সরকারগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং শরণার্থীদের হয়রানি করতে ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া (৩৮% রেড নোটিশের জন্য দায়ী), চীন (উইঘুরদের লক্ষ্য করে), তুরস্ক (কুর্দি কর্মী এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে), ইরান, ভেনেজুয়েলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রেড নোটিশ জারি করে, যা ইন্টারপোলের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদ (রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ) লঙ্ঘন করে। এর ফলে নির্দোষ ব্যক্তিরা ভ্রমণে বাধা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা বা ভিসা পাওয়ায় সমস্যা ভোগ করেন, এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়েন।

সমালোচকরা বলেন, ইন্টারপোলের কমিশন ফর দ্য কন্ট্রোল অফ ফাইলস (CCF) অভিযোগগুলো পর্যালোচনায় অপর্যাপ্ত, অস্বচ্ছ এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল, যা অভিযোগের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া নেতৃত্ব নির্বাচনে হস্তক্ষেপ (যেমন ২০১৮ সালে মেং হংওয়ের গ্রেপ্তার বা ২০২১ সালে আহমেদ নাসের আল-রাইসির নির্বাচন, যিনি নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত), প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তি (যেমন ফিফা বা তামাক শিল্পের অনুদান) এবং তাইওয়ানের মতো দেশগুলিকে সংস্থা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থা ইন্টারপোলের সংস্কারের দাবি করেছে, যাতে এর রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ এবং জবাবদিহিতা বাড়ানো যায়, যদিও ইন্টারপোল ২০১৫ সাল থেকে কিছু সংস্কার শুরু করেছে।

 

আরও পড়ুন- জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়-দায়িত্ব ও কার্যাবলি

 

You cannot copy content of this page