আন্তর্জাতিক আইনের আতসে মাদুরো ‘গ্রেফতার’
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্বস্ত্রীক গত ৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স ধরে নিয়ে গিয়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে অন্য একটি রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কর্তৃক তার নিজ ভূখণ্ড থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আইনগত দিক থেকেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনাকে অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ‘ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না।
তাছাড়া আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে) ২০০২ সালের একটি আলোচিত রায়ে পরিষ্কার করেছে, পদে থাকাকালীন একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অন্য কোনো দেশের আদালতে মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা যাবে না, এমনকি যদি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগও থেকে থাকে। এই বিধান আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান ভেনিজুয়েলার সম্মতি ছাড়াই সংঘটিত হওয়ায় তা সরাসরি ওই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক আইনে শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল দুটি ব্যতিক্রম স্বীকৃত, একটি হলো আত্মরক্ষা এবং অন্যটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন। ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে এমন প্রমাণ নেই, আবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ থেকেও এ ধরনের কোনো অভিযানের অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি। ফলে এই অভিযানকে আত্মরক্ষা বা বৈধ আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেটের আওতায় ফেলাও কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের চোখে ‘অবৈধ শক্তি প্রয়োগ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রপ্রধানের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্ট অনুযায়ী আইনগত অবস্থান। আন্তর্জাতিক আইনে কার্যরত রাষ্ট্রপ্রধানরা সাধারণত সার্বভৌম দায়মুক্তি (immunity) ভোগ করেন, যার অর্থ হলো অন্য রাষ্ট্রের আদালতে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার চালানো যায় না। এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজ দেশেও আইনগত দায়মুক্তি ভোগ করেন। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫১ নং অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এই ধরনের দায়মুক্তি প্রদান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সংগঠিত অপরাধের অভিযোগ এনেছে, তবুও তিনি ভেনিজুয়েলার কার্যরত প্রেসিডেন্ট হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তার ব্যক্তিগত দায় ও রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি প্রশ্নটি অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে এসেছে। অনেক আন্তর্জাতিক আইনবিদের মতে, কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে অন্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করে নিজের আদালতে বিচার করলে তা আন্তর্জাতিক আইনের বিদ্যমান কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই অভিযানকে ‘আইন প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই যুক্তি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। আইন প্রয়োগ সাধারণত সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতি, প্রত্যর্পণ চুক্তি বা আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে সরাসরি গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যা ভবিষ্যতে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে ।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংগঠন একে আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখছে। যদি কোনো রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতা ও সামরিক শক্তির ওপর ভর করে অন্য রাষ্ট্রের শাসককে ধরে নিয়ে যেতে পারে তাহলে জাতিসংঘ সনদ, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এতে বিশ্বব্যবস্থায় ‘আইনের শাসন’ নয়, বরং ‘শক্তির শাসন’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
সব মিলিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার ও বিচার করার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইনের একাধিক মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষিক। এটি কেবল ভেনিজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সংকট নয় বরং আন্তর্জাতিক আইন কতটা কার্যকরভাবে শক্তিধর রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে প্রশ্নেরও এক বড় পরীক্ষা। এই ঘটনা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
*লেখক: রোমন তালুকদার, সাব-এডিটর, জুরিস্টিকো।
আরও পড়ুন- ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা
