সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের সাংবিধানিক মাধ্যম। তাই কে প্রার্থী হতে পারবেন, আর কে পারবেন না এই প্রশ্নের উত্তর সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। এই যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়গুলো শুধু আইনি নয়, গণতন্ত্রের নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা স্পষ্ট করা হয়েছে। সংবিধানের ৬৬(১) নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যোগ্যতার দিক থেকে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। পাশাপাশি তার বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হতে হবে। এর মাধ্যমে সংবিধান নিশ্চিত করতে চায় যে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন এমন ব্যক্তিরা একটি নির্দিষ্ট পরিপক্বতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ নিয়ে রাজনীতিতে আসবেন।
অন্যদিকে অযোগ্যতার বিষয়গুলো আরও বিস্তৃত ও নীতিনির্ভর। সংবিধানের ৬৬(২)(ক) অনুযায়ী, মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা অপ্রকৃতিস্থতার জন্য আদালত কর্তৃক অযোগ্য ঘোষিত ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারেন না। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আইন প্রণয়নকারী সর্বোচ্চ ফোরামে এমন ব্যক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যিনি যুক্তিবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম।
একইভাবে, সংবিধানের ৬৬(২)(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হন এবং এখনও অব্যাহত দেউলিয়া অবস্থায় থাকেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য। সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারান। এটি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সাংবিধানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এছাড়া সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত হন এবং তার মেয়াদ যদি অন্যূন দুই বছর হয় এবং সেই দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যদি পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হয়, তবে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি কেবল আইনি নয়, নৈতিক ও সামাজিক মানদণ্ডের প্রশ্নও তুলে ধরে।
তাছাড়া সংবিধানের ৬৬(২)(ঙ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন ব্যাক্তি যদি ১৯৭২ সালের দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন যে কোন অপরাধে দন্ডিত হয়ে থাকেন তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন।
এছাড়াও সংবিধানের ৬৬(২)(চ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি প্রজাতন্ত্রের কোন লাভজনক পদে নিয়জিত থাকেন যা আইনের দ্বারা অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন ।
এছাড়া সংবিধানের ৬৬(২)(ছ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোন ব্যক্তি আইনের দ্বারা অনুরূপ কোন কারণে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য অযোগ্য হবেন।
সংবিধানের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের প্রণীত বিধিমালা ও নির্বাচনী আচরণবিধিও প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত আরোপ করেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং নির্বাচনী বিধিমালার আলোকে প্রার্থীদের হলফনামা দাখিল করতে হয়, যেখানে তাদের সম্পদ, আয়-ব্যয়, ঋণ, মামলা-মোকদ্দমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশার তথ্য দিতে হয়। এসব তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে প্রার্থিতা বাতিলের পাশাপাশি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনি যোগ্যতা থাকলেই সব দায় শেষ হয়ে যায় না।
নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী, বিচারক, সামরিক বাহিনীর সদস্য ও নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদত্যাগ ছাড়া প্রার্থী হতে পারেন না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সমতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সীমারেখা কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না। মামলাজট, তথ্য গোপন কিংবা প্রভাব খাটিয়ে প্রার্থী হওয়ার নজির এদেশে নতুন নয়। ফলে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগই হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় সংসদ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। সেখানে যাঁরা যাবেন তাঁদের শুধু আইনের চোখে যোগ্য হলেই চলবে না নৈতিকভাবেও জনগণের আস্থা অর্জনের মতো মানুষ হতে হবে। সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা আমাদের সেই কাঠামো দিয়েছে, এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আইনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় আমরা কেমন সংসদ চাই? এমন সংসদ যেখানে কেবল ক্ষমতার লড়াই হবে? নাকি এমন সংসদ যেখানে যোগ্যতা, সততা ও জনস্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে? সংবিধান ও বিধিমালা আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথে হাঁটার দায়িত্ব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপরই নির্ভর করে।
*লেখক: রোমন তালুকদার, সাব-এডিটর, জুরিস্টিকো।
আরও পড়ুন- নির্বাচন কমিশনের দায়-দায়িত্ব ক্ষমতা ও কার্যাবলি
