HomeLaw News

হাইকোর্টের রায়ে পূর্ণ স্বাধীন হলো বিচার বিভাগ

বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সম্বলিত সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদের সংশোধনীকে ‘অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী’ হিসেবে ঘোষণা করে বাহাত্তরের মূল সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদ বহাল করে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এ রায়ের ফলে অধস্তন আদালতের  সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ( বিচারক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরে এলো।

গতকাল মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

উক্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের পাঠানো প্রস্তাবনা অনুসারে আগামী ৩ মাসের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও রায়ে ২০১৭ সালে প্রণীত জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিামালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয়েছে। এখন থেকে অধ্বস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য সুপ্রিম কোর্ট আর রাষ্ট্রপতি তথা সরকারের মুখাপেক্ষী থাকলো না।

আদালতে এ রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। এছাড়াও ইন্টারভেনার (ব্যাখ্যাকারী) হিসেবে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন আইনজীবী আহসানুল করিম।

রায় ঘোষণার পরে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, “এ রায়ের ফলে অধ্বস্তন আদালতের বিচারক ও কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি) ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরেছে। এর ফলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নামে বিচারকদের বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে আর কোনো নাটাই থাকল না। নির্ভয়ে তারা রায় দিতে পারবেন। রায় দেওয়ার পর নির্বাহী কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ে রাতের আঁধারে বিচারকদের বদলির আর কোনো ভয় থাকল না। এটি একটি ঐতিহাসিক রায়।”

মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় ঘোষণা শুরু করেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী রায় ঘোষণা করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আহমেদ সোহেল।

চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল অধ্বস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদের বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। পরে গত ১৩ আগস্ট রুল জারির মাধ্যমে চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়। ঐদিন এই মামলার রায়ের জন্য ২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়।

বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ নং অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদন নিষ্পত্তির জন্য গত ২০ এপ্রিল হাইকোর্টে বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

এর আগে মামলাটি বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষায় ছিল। তবে, গত ২৪ মার্চ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় সেই বেঞ্চটি ভেঙে যায়। এরপর মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য নতুন বেঞ্চ নির্ধারণের জন্য আবেদন করেন রিটকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির গত বছরের (২০২৪ সালের) ২৫ আগস্ট ১০ জন আইনজীবীর পক্ষে মূল সংবিধানের ১৯৭২ সালের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। পরে হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চান– “বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না?”

বিদ্যমান সংশোধিত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে।’ কিন্তু ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘বিচারকর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্বে নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।’যা ১৯৭৪ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির উপর ন্যসত করা হয়।

বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলাবিধির ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব রয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

You cannot copy content of this page