AnalysisBD LawsHome

বাংলাদেশে যৌতুকপ্রথার প্রতিকার ও প্রতিরোধ

যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি, যা বর্তমানে নারী নির্যাতনের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। যৌতুকের নির্মমতায় বহু নারী হারিয়েছে তাদের প্রাণ, আবার হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন অসংখ্য নারী। প্রতিদিন যৌতুকের বলি হয়ে ঘর ছাড়া হচ্ছে শতশত নারী আবার এই যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের কঠোরতায়ও যেনো আটকানো যাচ্ছে না এই ঘৃণ্যতম অপরাধ, বরং  ক্রমাগত ভাবে বাড়ছে এই ব্যাধির সংক্রমণ।

 

আইনে যৌতুকের সংজ্ঞায়ন

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২(ঞ) ধারা অনুসারে,  “(অ) কোন বিবাহের বর বা বরের পিতা বা মাতা বা বিবাহের সাথে জড়িত বর পক্ষের অন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক উক্ত বিবাহের সময় বা পূর্বে বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকাকালে, বিবাহ স্থির থাকার শর্তে, বিবাহের পণ হিসাবে বিবাহের কনে পক্ষের নিকট দাবীকৃত অর্থ, সামগ্রী বা অন্যকোনো সম্পদ।”

অথবা

“(আ) কোন বিবাহের কনে পক্ষ কর্তৃক বিবাহের বর বা বরের পিতা বা মাতা বা বিবাহের সাথে জড়িত বর পক্ষের অন্য কোন ব্যক্তিকে উক্ত বিবাহের সময় বা পুর্বে বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকাকালে, বিবাহ স্থির থাকার শর্তে, বিবাহের পণ হিসাবে প্রদত্ত বা প্রদানে সম্মত অর্থ, সামগ্রী বা অন্যকোনো সম্পদ।”

২০১৮ সালের যৌতুক নিরোধ আইনের ২(খ) ধারা অনুসারে,“ বিবাহের এক পক্ষ দ্বারা অন্য পক্ষের নিকট বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের শর্ত হিসাবে বিবাহের সময় বা আগে বা বৈবাহিক অবস্থা বিদ্যমান থাকাকালে, বিবাহ চলমান রাখার শর্তে, বিবাহের পণ বাবদ, দাবিকৃত বা বিবাহের এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রদান করার জন্য সম্মতি দিয়েছে এমন অর্থ-সামগ্রী বা অন্য কোনো সম্পদ।”

 

যৌতুকের ভয়াবহতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭৫.৯ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গ্রামে এই হার ৭৬ শতাংশ এবং শহরে ৭৫.৬ শতাংশ।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুসারে, এই সময়ে যৌতুকের জন্য ৩৫৫ জনকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। যৌতুক-সম্পর্কিত সহিংসতায় ২৯০ জন নারীর মৃত্যু হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্যমতে,২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) এবং যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় সারা দেশে ২২ হাজার ২৭৭টি মামলা হয়েছে। ২০২২ সালের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর) এ দুই আইনে মামলা হয়েছে ৯ হাজার ১১৪টি।

 

বাংলাদেশের আইনে যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি

২০১৮ সালে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারা অনুসারে, “যদি বিবাহের কোনো এক পক্ষ  অন্য কোনো পক্ষের নিকট কোনো যৌতুক দাবি করেন, তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছর কিন্তু সর্বনিন্ম ১ (এক) বছরে কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।”

উক্ত আইনের ৪ ধারা অনুসার,  “যদি বিবাহের কোনো এক পক্ষ যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করেন অথবা যৌতুক প্রদান বা গ্রহণে সহায়তা করেন বা যৌতুক প্রদান বা গ্রহণের উদ্দেশ্যে চুক্তি করেন, তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছর কিন্তু সর্বনিন্ম ১ (এক) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।”

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ১১ অনুসারে-

(ক) যৌতুকে জন্য মৃত্যু ঘটানো হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে।

(কক) যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করা হলে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে বা সর্বোচ্চ বার বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ড;

(খ) যৌতুকের জন্য মারাত্মক জখম  করা হলে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ বার বছর কিন্তু সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ড।

(গ) যৌতুকের জন্য  সাধারণ জখম করা হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কিন্তু সর্বনিন্ম দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ড।

 

যৌতুকের মিথ্যা মামলা এবং এর শাস্তিসমূহ

রাষ্টীয় আইনের কঠোরতার অপব্যবহার করছে গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ, যার মাধ্যমে হয়রানির স্বীকারও হচ্ছেন অগণিত।

যৌতুকের জন্য এই কঠোর আইন যেনো কেউ অপব্যবহার করে কাউকে হেনস্তা করতে না পারে যেজন্যও শাস্তি বিধান করা হয়েছে।

১. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ১৭ অনুসারে কেউ যদি অপর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌতুকের মিথ্যা মামলা, অভিযোগ দায়ের করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন

২. কোন অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর রায় প্রদানকালে যদি ট্রাইব্যুনালের নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয় যে, কোন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তাহলে উক্ত ট্রাইব্যুনাল মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর সুযোগ প্রদান করবেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ  প্রদানের আদেশ দিতে পারেন।  প্রয়োজনে মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার আদেশ দিতে পারেন।

৩. যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ সালের ৬ ধারা অনুসারে যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্য উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা বা অভিযোগ করার কারণ না থাকার কারণেরও যদি মামলা দায়ের করেন তাহলে তিনি সর্বোচ্চ  ৫ (পাঁচ) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

 

যৌতুক নিরোধের কার্যকর উপায়

যৌতুক নিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে সমাজ, পরিবার, সরকার ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। কঠোর আইনের পাশাপাশি এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয়ত, যৌতুকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেমন, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যৌতুকের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।

তৃতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষমতায়নের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নারীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে যৌতুক নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

চতুর্থত, বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের সময় যৌতুকবিরোধী ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে এবং যারা যৌতুক ছাড়া বিয়ে করেন তাদের জন্য সরকারি সনদ বা স্বীকৃতি প্রদান করা যেতে পারে। এছাড়া, যৌতুকবিরোধী পরিবার ও ব্যক্তিকে পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার পরিচালিত জাতীয় ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন ৯৯৯ এ কল করে যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটন কালে অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়। এছাড়াও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হটলাইন ১০৯২১ এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের হটলাইন ১০৯ এ কল করেও যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকার পাওয়া যায়। 

*লেখক: আফরিন মাঈশা: আইনের শিক্ষার্থী; কন্ট্রিবিউটর, জুরিস্টিকো।

 

আরও পড়ুন- গ্রেফতার ও আটকের পার্থক্য

 

You cannot copy content of this page