ExplanationHome

ক্যাঙ্গারু কোর্ট কী?

আইনি পরিভাষায় ক্যাঙ্গারু কোর্ট (Kangaroo Court) একটি বিদ্রূপাত্মক শব্দ, যা এমন এক অননুমোদিত, ভুয়া বা লোক-দেখানো বিচার ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে ন্যায্য বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এই শব্দটি কোনো বৈধ আদালতকে নয়, বরং এমন একটি বিচার প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করে যা আইনের স্বীকৃত মানদণ্ড, নিরপেক্ষতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে।

সংক্ষেপে, ক্যাঙ্গারু কোর্ট হলো সেই বিচার, যার রায় বা শাস্তি বিচারের আগেই স্থির করা থাকে।

‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ শব্দটির উৎপত্তি রহস্যময় এবং এর নামকরণের ইতিহাস বেশ কয়েকটি তত্ত্বে বিভক্ত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই শব্দটি অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু প্রাণীর আদি ভূমি থেকে আসেনি, বরং এর জন্ম হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

 

ইতিহাসবিদরা ১৮৪১ সালে প্রকাশিত একটি মার্কিন সংবাদপত্রকে (The Daily Picayune, New Orleans) এই শব্দটির প্রথম লিখিত উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেখানে কঙ্গোকর্ডিয়া ইন্টেলিজেন্সারের একটি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করা হয়েছিল, যেখানে একাধিক গণপিটুনির (lynchings) কথা বলা হয়, যা “ক্যাঙ্গারু কোর্ট” দ্বারা “বিভিন্ন অভিযোগে” করা হয়েছিল। এর থেকেই বোঝা যায়, শব্দটি সে সময়েই অন্যায্য ও দ্রুত বিচারের সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

অস্ট্রেলিয়ান সংযোগ: সোনা সন্ধানের জন্য অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ক্যালিফোর্নিয়ায় ভিড় করে। অস্ট্রেলিয়ানদের উপস্থিতির কারণে, স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্যাঙ্গারু শব্দটি সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

ক্লেম-জাম্পিং বিচার: গোল্ড রাশের সময় খনি শ্রমিকরা প্রায়ই দ্রুত ও অনানুষ্ঠানিক বিচার পরিচালনা করত “ক্লেম-জাম্পিং” (অন্যের খনির জায়গা জোর করে দখল করা) এর মতো অপরাধের জন্য। এই বিচারগুলি এত দ্রুত ও পক্ষপাতদুষ্টভাবে সম্পন্ন করা হতো যে, অস্ট্রেলিয়ান প্রাণী ক্যাঙ্গারুর দ্রুত লাফিয়ে যাওয়ার গতির সঙ্গে এর তুলনা করা হয়।

 

‘লাফিয়ে ওঠা’ বিচার (Jumping Up): এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যেহেতু এই আদালতগুলি প্রায়শই কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি বা আইনি প্রক্রিয়ার ধাপ অনুসরণ না করে হঠাৎ করে দ্রুত ‘লাফিয়ে ওঠে’ (jumped up) এবং রায় ঘোষণা করে দেয়, তাই এর নাম হয়েছে ক্যাঙ্গারু কোর্ট।

পকেটের আদালত (In Someone’s Pocket): আরেক মতে, নামটি ক্যাঙ্গারুর পেটের থলি (Pouch) থেকে আসতে পারে। এর দ্বারা বোঝানো হয়, বিচারকের সিদ্ধান্তটি কারও পকেটে বা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অর্থাৎ বিচারটি দুর্নীতিগ্রস্ত বা পক্ষপাতদুষ্ট।

 

ঊনবিংশ শতকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাঙ্গারু কোর্টের একটি বিকল্প শব্দ ছিল ‘মুস্ট্যাং কোর্ট’ (Mustang Court)। মুস্ট্যাং ছিল পশ্চিমের বুনো ঘোড়া, যা দ্রুত এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাফেরা করে—যা এই অনিয়ন্ত্রিত বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ক্যাঙ্গারু কোর্টের মূল বৈশিষ্ট্য

একটি বিচার প্রক্রিয়াকে কখন ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা হয়? মূলত নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি উপস্থিত থাকলে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়:

  1. পূর্বনির্ধারিত রায়: এই আদালতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—ফলাফল আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। শুনানি কেবল লোক দেখানোর জন্য করা হয়।

  2. ন্যায্য প্রক্রিয়ার অভাব: সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই, আইনি পরামর্শ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের মতো মৌলিক আইনি প্রক্রিয়াগুলিকে দ্রুত বা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

  3. পক্ষপাতিত্ব ও বিদ্বেষ: বিচারক বা বিচার পর্ষদ অভিযুক্তের প্রতি স্পষ্টতই বিদ্বেষী হন এবং নিরপেক্ষতার বদলে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

  4. অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক ভিত্তি: এর কোনো আইনি ভিত্তি বা এখতিয়ার থাকে না। কারাগারের কয়েদিদের মধ্যে বা শ্রমিকদের দলগত বিরোধ নিষ্পত্তির মতো অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে এটি দেখা যেতে পারে, অথবা বৈধ বিচার ব্যবস্থার ভেতরেও যখন ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয়, তখন এই শব্দটি সমালোচনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

আজও ইংরেজি-ভাষী বিশ্বে (Anglosphere) এবং সারা বিশ্বে গণমাধ্যমে কোনো বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান আইন এবং নীতির তোয়াক্কা না করে দ্রুত ও অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তখন এই শব্দটি সেই প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

 

আরও পড়ুন- সিনিয়র অ্যাডভোকেট বলতে কি বুঝায়?