বার কাউন্সিল এমসিকিউ পরীক্ষা: শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
আসন্ন বার কাউন্সিল (এডভোকেটশীপ) এমসিকিউ পরীক্ষা আগামী জুনের ১২ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি হচ্ছে বারবার রিভিশন করা এবং মডেল টেস্ট সলভ করা। এখন নতুন করে আর কিছু পড়ার সময় নেই; নতুন পড়া পড়তে গেলে আগের পড়া আরও গুলিয়ে ফেলবেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ২-৩টি আইন রিভিশন দিতে হবে এবং ২-৩টি মডেল টেস্ট সলভ করতে হবে।
কোনো সেকশন বা কিছু সেকশন জটিল মনে হলে একদম স্কিপ করবেন। আপনাকে ৯০ পেতে হবে না, ৫০ পেলেই পাস। সিপিসি (CPC), সিআরপিসি (CrPC) ও পেনাল কোড (Penal Code)—এই বড় তিনটি আইনের প্রতিটি থেকে ২০টি করে প্রশ্ন থাকবে। এখানে ২০টির মধ্যে আপনাকে ১৫-১৬টি কারেক্ট করতে পারলেই মাচ অ্যানাফ (Much enough)। জটিল কোনো টপিক নতুন করে পড়তে গিয়ে বা বুঝতে গিয়ে যে সময় যাবে, সেই সময়ে অন্য আরও অনেক পড়া শেষ করে ফেলতে পারবেন।
এখন দরকার রিল্যাক্সে থাকা। আন্দাজে দাগানোর অভ্যাস ছেড়ে দিন। প্রথমে একদম সিওর (Sure) যেগুলো পারবেন, সেগুলো দাগিয়ে সেফ জোনে চলে আসলে আর অতিরিক্ত আন্দাজে দাগানোর প্রয়োজন নেই। শুরু থেকেই সিওর পারাগুলো আর কনফিউজিংগুলো একসাথে দাগিয়ে ফেললে পরে দেখা যাবে মাইনাস মার্কিংয়ের কারণে আপনার ফেল চলে আসতে পারে; অথচ দেখা গেল শুধু সিওর পারাগুলো দাগালেই এমনিই পাস নম্বর চলে আসত। এমসিকিউতে আপনার পাস করা জরুরি, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে মেধাক্রমে থাকা নয়।
যদি আপনি পাস নম্বরের বেশি কারেক্ট করতে পারেন, তবে অবশ্যই দাগিয়ে আসবেন। কারণ ভাইভা বোর্ডে পরীক্ষকদের কাছে এমসিকিউর রেজাল্ট শিট থাকে। বেশি নম্বর পেলে প্রিভিলেজ পাওয়া যায় এবং পরীক্ষকদের সফট কর্নার কাজ করে কিন্তু তার মানে এই না যে, আপনি টেনেটুনে ৫০ পেলে আপনাকে ভাইভাতে ফেল করিয়ে দেবে; কেননা আইন অনুযায়ী আপনি ৫০ পেলেই পাস, এখানে কোনো কাট মার্ক বা মেধাক্রম নেই।
শর্ট সাজেশনের বিষয়ে করণীয়
বিভিন্ন ধরনের শর্ট সাজেশন এখন সর্বত্র পাওয়া যাবে। এসবের পেছনে দৌড়ে কিংবা এসব পড়ে সময় নষ্ট করে নিজের এতদিনের প্রিপারেশন নষ্ট করবেন না। বরং এতদিন যা পড়েছেন, তা-ই এখন ঝালাই করে নেয়া যথার্থ। অনেকের দেখা যাবে এখন ১-২টি বড় আইন ভালোভাবে শেষ করা হয়নি; এক্ষেত্রে করণীয় হলো নিজে শর্ট সাজেশন তৈরি করা। ‘প্রিলি মাস্টার’ বইয়ে প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো দেওয়া আছে, আমি শুধু এই ধারাগুলোই পড়েছিলাম।
এক্ষেত্রে যাদের পড়া বাকি আছে, তাদের আরও সংক্ষিপ্ত সাজেশন রেডি করার একটি পরামর্শ দিচ্ছি—বিগত সনের বার কাউন্সিল এবং বিজেএস (BJS) পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোর ধারাগুলো শুধু পড়লেও ৬০-৭০% কমন পাওয়া যাবে, যা পাসের জন্য যথেষ্ট। আমার পরীক্ষার ১৫ দিন আগে সিপিসি একদম আনটাচড (Untouched) ছিল। তখন আমি বাকি আইনগুলো রিভিশন করা আর মডেল টেস্ট সলভের পাশাপাশি সিপিসিতে বিগত সনের বার কাউন্সিল এবং বিজেএস পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোর ধারাগুলো শুধু পড়েছিলাম। এভাবে তিন দিনের মধ্যে সিপিসির প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলাম এবং মূল পরীক্ষাতেও কমন পেয়েছিলাম।
মডেল টেস্ট যেভাবে সলভ করবেন
আমি মডেল টেস্ট সলভ করেছিলাম ‘মিনি ল স্কুল’ -এর ‘মডেল টেস্ট মাস্টার বুক’ থেকে। পড়তে পড়তে যখন টায়ার্ড হয়ে যাবেন কিংবা পড়তে ইচ্ছা করবে না, তখন ১-২টি মডেল টেস্ট সলভ করে ফেলবেন। মডেল টেস্ট সলভ করার সময় প্রথমে উত্তর না দেখে ওএমআর (OMR) শিটে পরীক্ষা দেবেন। ঘড়ি ধরে ৪০ মিনিট সময়ের মধ্যে একটি ১০০ নম্বরের মডেল টেস্ট সলভ করার চেষ্টা করবেন।
এক্ষেত্রে মিনি ল’ স্কুলের রায়হান সোবহান স্যারের পরামর্শ আমি ফলো করেছিলাম। স্যার বলতেন, মডেল টেস্ট সলভ করার পর উত্তর মেলানোর পর যেগুলো আপনি পারবেন না, সেই প্রশ্নগুলোর ধারাগুলো খুব ভালোভাবে পড়ে ফেলবেন। উত্তর মেলানোর সময় আপনার পারা ধারার কোনো প্রশ্নের উত্তরও যদি ভুল হয়, তাহলে ডিরেক্ট ওই ধারাগুলোতে চলে যাবেন— কেন আপনার ভুল হয়েছে তা বের করবেন এবং ধারাগুলো ভালোভাবে রপ্ত করে নেবেন। ধারাগুলো ভালোভাবে পড়া হয়নি বলেই আপনি ভুল করছেন। এবার যে আপনি পড়বেন, এই পড়াটা খুব ভালোভাবে হবে এবং এই ভুল আপনি আর দ্বিতীয়বার করবেন না।
রায়হান সোবাহান স্যার বলতেন: “আপনি যদি পরীক্ষার আগে ২০টি মডেল টেস্ট সলভ করেন এবং প্রত্যেকটি মডেল টেস্টে ৩৫টি করে প্রশ্নের উত্তর না পারেন, আর ওই ধারাগুলো যদি আপনি পড়ে নেন—তাহলে আপনার ২০টি মডেল টেস্ট ৩৫টি ধারা = ৭০০টি ধারা ভালোভাবে পড়া হয়ে যাবে।”
মডেল টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার পর না-পারা প্রশ্নগুলোর ধারাগুলো ভালোভাবে না পড়ে আপনি পড়া থেকে উঠবেন না। আর রায়হান সোবাহান স্যারের ভাষ্যমতে, মডেল টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে আপনি যদি ৬৫ পান, তাহলে আপনি সেফ জোনে আছেন।
রাত পোহালেই ঈদ, কিন্তু ঈদের জন্য পড়ালেখা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। বড়জোর আপনি ঈদের দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পড়া বন্ধ রাখতে পারেন, কিন্তু রাতে অবশ্যই পড়া শুরু করে দেবেন। আমি পরীক্ষার আগে ঈদের দিন দুপুরবেলায়ও পড়তে বসেছিলাম। ঈদ অনেক করতে পারবেন; এবার যদি স্যাক্রিফাইস করেন, তাহলে সামনের ঈদ আপনি অ্যাডভোকেট হয়ে উদযাপন করতে পারবেন—তখন ঈদের আনন্দ আরও দ্বিগুণ হবে।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার—এবার ঈদ উদযাপন করে আইনজীবী হতে না পেরে সামনের ঈদ বিমর্ষ ও মনমরা হয়ে কাটাবেন, নাকি পরবর্তী ঈদ আইনজীবী হয়ে দ্বিগুণ আনন্দের সাথে উদযাপন করবেন?
আপনারা ভালোভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন, নিজের এবং নিজের পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করুন। সবার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
*লেখক: খন্দকার শাফায়েত উল্লাহ্ আশিক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কিশোরগঞ্জ।
