বাংলাদেশের সংসদ কি সার্বভৌম?
সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) মানে হলো সর্বোচ্চ ক্ষমতা। সংসদীয় সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায়, একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকে। সংসদ যে কোনো আইন তৈরি, পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান (যেমন আদালত বা রাষ্ট্রপতি) সাধারণত সংসদের এই ক্ষমতার উপর চূড়ান্তভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
এই ধারণাটি অলিখিত সংবিধানের ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। যুক্তরাজ্যে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান। সেখানে Westminster Parliament-এর ক্ষমতা কার্যত সীমাহীন বলে বিবেচিত। আইনবিদ A. V. Dicey-এর মতে, সংসদীয় সর্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে যেসব দেশে লিখিত সংবিধান বিদ্যমান, সেখানে এই ধারণা পুরোপুরি প্রযোজ্য হয় না। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব নেই; বরং সংবিধানই এসব দেশে সর্বোচ্চ আইন হিসেবে স্বীকৃত। উল্লেখিত দেশগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়ে এ নীতি প্রতিষ্ঠিত যে, সংসদের ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ।
আমাদের দেশেও একাধিক রায়ের মাধ্যমে সার্বভৌমত্বের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।
পঞ্চম সংশোধনী মামলায় প্রধান বিচারপতি মো. তোফাজ্জুল ইসলাম বলেন, “আমাদের দেশে common law নীতি অনুসরণ করা হলেও, বাংলাদেশ-এর একটি লিখিত সংবিধান রয়েছে। বাংলাদেশের সংসদ যুক্তরাজ্যের মতো সার্বভৌম নয়। বাংলাদেশের জনগণ, নিজেদের জন্য সংবিধান তৈরি করেছে। সংবিধান দেশের মৌলিক বা সর্বোচ্চ আইন।”
এরপর ষোড়শ সংশোধনী মামলায় বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসাইন বলেন, “আমাদের সংবিধানিক ব্যবস্থায় সংসদ সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী নয়। সর্বোচ্চ আইন হলো সংবিধান। সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংবিধানের অধীন।”
একই মামলায় বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী বলেন, “রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কোনো অঙ্গই সংবিধানে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে না। প্রতিটি অঙ্গকে সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার মধ্যে কাজ করতে হবে। কোনো অঙ্গই অন্য কোনো অঙ্গের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারে না। প্রতিটি অঙ্গ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনস্বরূপ সংবিধান অনুযায়ী কাজ করে। তাই বিচার বিভাগ যখন আইনসভা দ্বারা প্রণীত কোনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, তখন বিচার বিভাগ শুধু তার সংবিধানিক কর্তব্য পালন করে, আর কিছু নয়।”
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ভারতীয় বিশিষ্ট আইনবিদ ননী পালখিওয়ালা-এর ‘We, the Nation’ গ্রন্থের রেফারেন্স দেন। তিনি বলেন যে, “শুধুমাত্র জনগন সার্বভৌম। সংবিধান সর্বোচ্চ আইন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল সংবিধানের মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের উপকরণ। সার্বভৌম ক্ষমতা বা সীমাহীন ক্ষমতা কোন পদ বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত নয়। সংসদের সার্বভৌমত্ব দাবি করা সরাসরি সর্বোচ্চ আদালতের প্রতিষ্ঠিত নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক।”
অতএব, উপরোল্লিখিত রায়সমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের দেশে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ। সংবিধান সেই জনগণের ইচ্ছার সর্বোচ্চ ও পরম অভিব্যক্তি। দেশের জনগণ স্বেচ্ছায় সংবিধানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে গ্রহণ করেছে। সংসদ হলো রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি অঙ্গের মধ্যে একটি অঙ্গ। এই হিসেবে, সংসদ সংবিধানের মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটা মাধ্যমমাত্র, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
সৌজন্যে: ল’ল্যাব।
