অ্যাটর্নি জেনারেলের যোগ্যতা সুযোগ-সুবিধা ও কার্যাবলি
অ্যাটর্নি জেনারেল (Attorney General) হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা, প্রধান আইন পরামর্শক (Chief Legal Advisor) এবং সুপ্রীম কোর্টে সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী সর্বোচ্চ আইনজীবী। রাষ্ট্রের আইন ও সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষা এবং সরকারের আইনি স্বার্থ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান (The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh) এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইন ও নীতিমালা অনুসারে অ্যাটর্নি জেনারেল পদের সৃষ্টি, ইতিহাস, যোগ্যতা, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব এবং সুযোগ-সুবিধা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ধারণা (Concept of Attorney General)
অ্যাটর্নি জেনারেল (Attorney General) মূলত একটি কমন ল‘ (Common Law) ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত পদ, যার অর্থ হলো রাজার বা রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবী (Chief Lawyer of the State)। কমন ল’ পদ্ধতির দেশগুলোতে এই পদটি সরকারের আইনি শাখা ও বিচার বিভাগের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
পদের ঐতিহাসিক বিবর্তন (Historical Evolution of the Post)
ভারতীয় উপমহাদেশে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটির জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। এই পদটি পূর্বে অ্যাডভোকেট জেনারেল (Advocate General) নামে পরিচিত ছিল।
- উপনিবেশিক যুগ (Colonial Era): ১৭৬৫ সালের রেগুলেশন অ্যাক্ট (Regulation Act) ১৭৭৩ এবং পরবর্তী আইনগুলোর মাধ্যমে এই অঞ্চলের সুপ্রীম কোর্টগুলোতে (যেমন কলকাতা সুপ্রীম কোর্ট) অ্যাডভোকেট জেনারেল পদ সৃষ্টি হয়। তিনিই ছিলেন সরকারের আইন বিষয়ক সর্বোচ্চ পরামর্শক।
- পাকিস্তান যুগ (Pakistan Era): ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানের সংবিধানের অধীনে এই পদটি কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল এবং প্রাদেশিক সরকারের জন্য অ্যাডভোকেট জেনারেল নামে বহাল থাকে।
- স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ৬৪ অনুচ্ছেদের অধীনে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি একটি সাংবিধানিক পদ (Constitutional Post) হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠা অ্যাটর্নি জেনারেলকে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রদান করে।
বাংলাদেশের সংবিধানে অ্যাটর্নি জেনারেল
বাংলাদেশের সংবিধানে চতুর্থ ভাগ (Executive)-এর ৫ম পরিচ্ছেদে (Chapter V) ৬৪ অনুচ্ছেদে অ্যাটর্নি জেনারেল সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। এটিই অ্যাটর্নি জেনারেল পদের মূল উৎস।
অনুচ্ছেদ ৬৪: অ্যাটর্নি–জেনারেল
১. নিয়োগ ও যোগ্যতা (Appointment and Qualification):
সংবিধানের ৬৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী,
“সুপ্রীম কোর্টের বিচারক হইবার যোগ্য কোন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি–জেনারেল পদে নিয়োগদান করিবেন।”
এই বিধানটি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদের জন্য দুটি মৌলিক বিষয় নির্ধারণ করে:
- নিয়োগকর্তা (Appointing Authority): মহামান্য রাষ্ট্রপতি। যদিও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে এই নিয়োগ দেন, তবে সাংবিধানিকভাবে এটি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার।
- যোগ্যতা (Qualification): তাঁকে সুপ্রীম কোর্টের (Supreme Court) বিচারক (Judge) হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
যোগ্যতা: সুপ্রীম কোর্টের বিচারক হওয়ার মানদণ্ড
অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ সুপ্রীম কোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্যতার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫(২) অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সুপ্রীম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না, যদি না তিনি—
- বাংলাদেশের নাগরিক (Citizen) হন; এবং
- (ক) সুপ্রীম কোর্টে অন্যূন দশ বৎসরকাল অ্যাভভোকেট (Advocate) না থাকিয়া থাকেন;
- অর্থাৎ, তাঁকে অবশ্যই কমপক্ষে দশ বছর (Ten Years) সুপ্রীম কোর্টের তালিকাভুক্ত এবং সক্রিয় আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
- অথবা
- (খ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে অন্যূন দশ বৎসর কোনো বিচার বিভাগীয় পদে (Judicial Office) অধিষ্ঠান না করিয়া থাকেন;
- অর্থাৎ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে কমপক্ষে দশ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
- অথবা
- (গ) সুপ্রীম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগলাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো যোগ্যতা না থাকিয়া থাকে।
অ্যাটর্নি জেনারেলকে সাধারণত সুপ্রীম কোর্টের জ্যেষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি কর্মকর্তার পদে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
মেয়াদকাল ও পারিশ্রমিক (Tenure and Remuneration)
সংবিধানের ৬৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
“রাষ্ট্রপতির সন্তোষানুযায়ী সময়সীমা পর্যন্ত অ্যাটর্নি-জেনারেল স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।”
- পদের স্থায়িত্ব (Tenure): তাঁর পদের স্থায়িত্ব রাষ্ট্রপতির সন্তোষের ওপর (Pleasure of the President) নির্ভরশীল। এর মানে হলো, অ্যাটর্নি জেনারেলের কোনো নির্দিষ্ট কার্যকাল (Fixed Term) নেই। রাষ্ট্রপতি (বাস্তবে, সরকার) যেকোনো সময় তাঁকে অপসারণ করতে পারেন। এই বিধানটি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটিকে একটি রাজনৈতিক নিয়োগ (Political Appointment) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে তিনি সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে কাজ করেন।
- পারিশ্রমিক (Remuneration): তাঁর বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত হয়। এটি একটি গেজেট প্রজ্ঞাপন বা আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব ও কার্যাবলি (Powers, Responsibilities, and Functions)
অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা ও কার্যাবলি দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: সাংবিধানিক দায়িত্ব (Constitutional Duties) এবং আইন ও প্রথাগত দায়িত্ব (Statutory and Conventional Duties)।
১. সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা
সংবিধানের ৬৪(২) ও ৬৪(৩) অনুচ্ছেদে অ্যাটর্নি জেনারেলের মূল দায়িত্ব ও ক্ষমতা বর্ণিত হয়েছে।
ক. দায়িত্ব পালন (Discharge of Duties)
৬৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী,
“অ্যাটর্নি–জেনারেল রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত সকল দায়িত্ব পালন করিবেন।”
এই বিস্তৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব তাঁকে সরকারের পক্ষ থেকে যেকোনো আইনি বিষয়ে কাজ করার অধিকার দেয়। এর মূল কাজ হলো সরকারকে আইনি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা।
খ. বক্তব্য পেশের অধিকার (Right of Audience)
৬৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী,
“অ্যাটর্নি–জেনারেলের দায়িত্বপালনের জন্য বাংলাদেশের সকল আদালতে তাঁহার বক্তব্য পেশ করিবার অধিকার থাকিবে।”
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার, যা অ্যাটর্নি জেনারেলকে বাংলাদেশের সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালে (All Courts and Tribunals) উপস্থিত হয়ে সরকারের পক্ষে সওয়াল করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে। এটি তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
২. আইন ও প্রথাগত কার্যাবলি
আইন ও প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল নিম্নলিখিত প্রধান কার্যাবলি সম্পাদন করেন:
| কার্যাবলির ক্ষেত্র (Scope of Functions) | বিস্তারিত আলোচনা (Detailed Discussion) |
| সরকারের প্রধান আইনি পরামর্শক (Chief Legal Advisor) | অ্যাটর্নি জেনারেল সরকারের নির্বাহী বিভাগ, সংসদ এবং সময়ে সময়ে রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিক ও আইনি বিষয়ে পরামর্শ দেন। এটি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সরকারের নেওয়া যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত বা আইনি সংস্কারের আগে তাঁর মতামতের প্রয়োজন হয়। |
| বিচারালয়ে সরকারের প্রতিনিধিত্ব (Representation in Courts) | সুপ্রীম কোর্ট (আপীল ও হাইকোর্ট বিভাগ) সহ দেশের সকল আদালতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি (Chief Counsel) হিসেবে মামলা পরিচালনা করেন। বিশেষ করে সংবিধানের ব্যাখ্যা, মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) সম্পর্কিত রিট মামলা এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট (Public Interest Litigation- PIL) মামলাগুলোতে তাঁর ভূমিকা মুখ্য। |
| আইনি মত প্রদান (Rendering Legal Opinion) | রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা প্রদান ও মতামত দেওয়া। যেমন, আন্তর্জাতিক চুক্তি (International Treaties), আন্তঃমন্ত্রণালয় বিরোধ (Inter-Ministerial Disputes), বা সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা। |
| ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা পরিচালনা (Criminal and Civil Cases) | সরকারের পক্ষে সকল গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারী (Criminal) আপিল, লিভ টু আপিল এবং দেওয়ানী (Civil) মামলা পরিচালনা করা এবং সরকারের পক্ষে আইন কর্মকর্তাদের নিযুক্ত করা ও নির্দেশ দেওয়া। |
| মৃত্যুদণ্ড কার্যকরীকরণ (Execution of Death Penalty) | মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আপিলের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতে সওয়াল করা এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ক্ষমা বা অন্যান্য বিষয়ে আইনি মতামত দেওয়া। |
| এক্স–অফিশিও দায়িত্ব (Ex-officio Duties) | তিনি পদাধিকারবলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের (Bangladesh Bar Council) সভাপতি (President) হিসেবে কাজ করেন, যা দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। |
| অন্যান্য আইন কর্মকর্তার তদারকি (Supervision of Other Law Officers) | তাঁকে সহায়তা করার জন্য নিয়োজিত অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল (Additional Attorney General), ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (Deputy Attorney General) এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের (Assistant Attorney General) কাজের তদারকি ও নির্দেশনা প্রদান করা। এই আইন কর্মকর্তারা The Bangladesh Law Officers Order, 1972 (P.O. No. 6 of 1972) দ্বারা নিযুক্ত হন এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অধীনে কাজ করেন। |
অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের কাঠামো
অ্যাটর্নি জেনারেলকে তাঁর কার্যাবলি সম্পাদনে সহায়তা করার জন্য একটি বিশাল অফিস রয়েছে, যা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত। এই অফিসের সাংগঠনিক কাঠামোয় বিভিন্ন শাখা বিদ্যমান:
- ফৌজদারী আপিল শাখা
- ফৌজদারী মিস্ শাখা
- সিভিল শাখা
- রিট শাখা
- কাস্টমস, ভ্যাট ও ইনকাম টেক্স শাখা ইত্যাদি।
এই শক্তিশালী কাঠামো অ্যাটর্নি জেনারেলকে রাষ্ট্রের আইনি কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক সহায়তা দেয়।
অ্যাটর্নি জেনারেলের সুযোগ–সুবিধা ও দায়দায়িত্ব (Benefits, Privileges and Responsibilities)
অ্যাটর্নি জেনারেল একটি সাংবিধানিক পদ হওয়ায় তিনি সরকারের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সমতুল্য সুবিধা ও মর্যাদা ভোগ করেন।
১. সুযোগ–সুবিধা (Privileges)
বাংলাদেশ আইন কর্মকর্তাবৃন্দ (শর্ত ও সেবা) রুলস, ১৯৭৩ অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেলের বেতন-ভাতার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়, যা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত, তবে তিনি সাধারণত নিম্নলিখিত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন:
- পারিশ্রমিক ও ভাতা (Remuneration and Allowances): তিনি একটি উচ্চমানের বেতন (Salary) এবং সরকার নির্ধারিত ভাতা (Allowances) পান। তাঁর বেতন-ভাতা সাধারণত সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের বেতনের সমতুল্য বা কাছাকাছি হয়ে থাকে।
- বাসস্থান ও পরিবহন (Accommodation and Transport): সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সুসজ্জিত সরকারি বাসভবন (Official Residence) এবং দাপ্তরিক কাজের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি (Official Car) ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা পান।
- অন্যান্য সুবিধা: বিদেশ ভ্রমণকালে বৈদেশিক মুদ্রা ভাতা (Foreign Currency Allowance), স্বাস্থ্যসেবা (Health Care), এবং একটি বিশাল প্রশাসনিক ও আইনি টিমের সহায়তা (Administrative and Legal Support)।
- এক্স–অফিশিও মর্যাদা: পদাধিকারবলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নেতৃত্ব দেন।
২. দায়দায়িত্ব (Responsibilities)
দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রে, অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি আইন ও নৈতিকতার মানদণ্ডে খুবই সংবেদনশীল। তাঁর প্রধান দায়দায়িত্বগুলো হলো:
- আইনের শাসন রক্ষা (Upholding the Rule of Law): রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর প্রধান দায়িত্ব হলো দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং নিশ্চিত করা যে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ সাংবিধানিক ও আইনানুগ।
- সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণ: আইনগতভাবে সরকারের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি কোনো ব্যক্তির আইনজীবী নন, বরং তিনি ‘রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি‘ (Attorney for the State) হিসেবে কাজ করেন।
- ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ (Ensuring Justice): যদিও তিনি সরকারের পক্ষে মামলা করেন, তথাপি সরকারের আইনি পরামর্শক হিসেবে তিনি ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের (Public Interest) পক্ষে কাজ করার নৈতিক দায়িত্ব বহন করেন।
- আইনের ব্যাখ্যা: সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সঠিক ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
- দায়বদ্ধতা (Accountability): যেহেতু তিনি রাষ্ট্রপতি (এবং প্রধানমন্ত্রী/আইন মন্ত্রণালয়ের) সন্তোষানুযায়ী পদে বহাল থাকেন, তাই সরকারের কাছে তাঁর আইনি সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে দায়বদ্ধ থাকতে হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল পদের গুরুত্ব ও সাংবিধানিক বিতর্ক (Significance and Constitutional Debate)
অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর কিছু দিক নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনি মহলে বিতর্ক রয়েছে।
পদের গুরুত্ব (Significance of the Post)
- আইন ও শাসন বিভাগের সেতুবন্ধন (Bridge between Legislature and Executive): তিনি সরকারের আইন প্রণয়ন ও শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি পথনির্দেশ দেন, যা সরকারকে স্বেচ্ছাচারী হওয়া থেকে রক্ষা করে।
- সংবিধানের অভিভাবকত্বে ভূমিকা: সুপ্রীম কোর্টে সাংবিধানিক আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনি অবস্থান খুবই শক্তিশালী।
- বার ও বেঞ্চের সমন্বয় (Coordination between Bar and Bench): বার কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে তিনি দেশের বিচারব্যবস্থা (Bench) ও আইনজীবী সমাজ (Bar)-এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধনে ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিকীকরণ ও মেয়াদকাল বিতর্ক (Politicization and Tenure Debate)
অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি প্রায়শই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, বিশেষ করে তাঁর নিয়োগ ও অপসারণের বিষয়ে।
- রাজনৈতিক নিয়োগ: যেহেতু তাঁর মেয়াদকাল ‘রাষ্ট্রপতির সন্তোষ‘ (Pleasure of the President)-এর ওপর নির্ভরশীল, তাই অ্যাটর্নি জেনারেল মূলত ক্ষমতাসীন দলের আস্থাভাজন হিসেবে নিয়োগ পান। এর ফলে, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে সাধারণত অ্যাটর্নি জেনারেলও পরিবর্তিত হন, যা এই পদের রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রকট করে তোলে।
- স্বাধীনতার প্রশ্ন: সমালোচকরা মনে করেন, ‘রাষ্ট্রপতির সন্তোষ’ থাকার কারণে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাজের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা (Neutrality) এবং স্বাধীনতা (Independence) বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এই ধারার পরিবর্তন করে যদি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল এবং বিচারকের মতো অপসারণ প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা যেত, তবে পদের স্বাধীনতা আরও বাড়তে পারত। তবে, যেহেতু তিনি রাষ্ট্রের প্রধান পরামর্শক, তাই শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল পদটি কেবল একটি আইনি পদ নয়, এটি সাংবিধানিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের এক উচ্চাসন। সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ দ্বারা তাঁর যোগ্যতা, নিয়োগ এবং বক্তব্য পেশের অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করে এই পদে অধিষ্ঠিত হন একজন বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ আইনজীবী, যিনি সরকার ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে আইনের শাসন (Rule of Law), ন্যায়বিচার (Justice) ও সাংবিধানিক আদর্শ (Constitutional Ideals) রক্ষায় নিবেদিত থাকেন। তাঁর ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব এবং সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় তাঁকে বাংলাদেশের বিচারিক ও নির্বাহী উভয় ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তিকে সুসংহত রাখার মাধ্যমে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
আরও পড়ুন- পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়-দায়িত্ব ক্ষমতা ও কার্যাবলি
