ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব লিগ্যাল এইড অ্যান্ড অ্যাডভাইস বনাম বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া ১৯৯৫
১৯৯৩ সালের আগস্টে ভারতের আইনাঙ্গণে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার কাউন্সিল অব ইণ্ডিয়ার একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া আইনজীবী পেশায় নতুন প্রবেশকারীদের বয়সসীমা নির্ধারণ করে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৯৩ সালের ২২ আগস্ট বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার এক বৈঠকে (রেজুলেশন নং ৬৪/৯৩) ‘বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া রুলস’-এর পার্ট VI-এর চ্যাপ্টার III-এ একটি নতুন বিধি বা ‘রুল ৯’ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ভারত সরকারের গেজেটে এই নতুন বিধিটি প্রকাশিত হয়। গেজেট প্রকাশের পরই দেশজুড়ে আইনের শিক্ষার্থী, প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন আইনি সহায়তা সংগঠনের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
বার কাউন্সিলের ওই নতুন ‘রুল ৯’ এ বলা হয়েছিল যে, “কোনো ব্যক্তি যদি স্টেট বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির (Enrollment) জন্য আবেদন করেন এবং সেই আবেদন করার দিন বা তার পূর্বে তাঁর বয়স ৪৫ বছর বা তার বেশি পূর্ণ হয়ে থাকে, তবে তাঁকে ভারতের কোনো আদালতে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যাবে না।”
ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ প্রণীত ১৯৬১ সালের মূল অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টে আইনজীবী পেশায় নতুন প্রবেশকারীদের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর নির্দিষ্ট করা ছিল এবং আইন ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা রাখা হয়নি। বার কাউন্সিল হঠাৎ করে আইনজীবী পেশায় নতুন প্রবেশকারীদের বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেয়ায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম নেয়।
এই সিদ্ধান্ত হাজার হাজার মানুষের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছিল। যারা জীবনের একটা পর্যায় পার করে আইন ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন বা অন্য কোনো পেশা থেকে অবসর নিয়ে নতুন করে ওকালতি পেশা শুরু করতে চেয়েছিলেন।
বার কাউন্সিলের এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ আইন স্নাতকদের মৌলিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ নাগরিক ও পেশাজীবীদের আইনি অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয় ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব লিগ্যাল এইড অ্যান্ড অ্যাডভাইস’ (Indian Council of Legal Aid & Advice) নামক একটি সংগঠন (এনজিও)। বার কাউন্সিলের একতরফা সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে এই সংগঠনটিসহ আরও বেশ কয়েকজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সরাসরি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন।
এই মামলাটিকে ‘স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বনাম নাগরিকদের পেশাগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার’- (“The statutory power of the Bar Council to regulate entry into the profession” বনাম “The fundamental right of citizens to practice any profession under Article 19(1)(g) of the Constitution”) এর এক ঐতিহাসিক আইনি লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
মামলার ফ্যাক্ট
১৯৯৩ সালের ২২ আগস্ট বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া একটি রেজুলেশন (নং ৬৪/৯৩) পাশ করে এবং ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তা সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে ‘বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া রুলস’-এর পার্ট VI-এর চ্যাপ্টার III-এ একটি নতুন বিধি বা ‘রুল ৯’ (Rule 9) যুক্ত করা হয়। এই নতুন বিধিতে শর্ত আরোপ করা হয় যে, কোনো ব্যক্তি স্টেট বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির আবেদন করার দিন বা তার পূর্বে বয়স ৪৫ বছর বা তার বেশি পূর্ণ করে থাকলে তাঁকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। অথচ, পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত ১৯৬১ সালের মূল ‘অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট’-এর ধারা ২৪ অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির পূর্বশর্ত ছিল কেবল ভারতের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম বয়স ২১ বছর পূর্ণ হওয়া এবং আইন ডিগ্রি থাকা; মূল আইনে কোনো সর্বোচ্চ বা ঊর্ধ্ব বয়সসীমা (Upper age limit) নির্ধারণ করা ছিল না।
বিচার্য বিষয়
‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব লিগ্যাল এইড অ্যান্ড অ্যাডভাইস বনাম বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ মামলার মূল বিচার্য বিষয় বা আইনি প্রশ্ন (Fact in Issue) হলো বার কাউন্সিলের প্রণীত রুল ৯-এর বৈধতা এবং এর আইনগত এখতিয়ার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ৩টি প্রশ্ন।
১. বিধিবদ্ধ ক্ষমতার পরিধি (Scope of Statutory Powers): প্রথম ও প্রধান বিচার্য বিষয় ছিল—১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট (Advocates Act, 1961)-এর বিধানাবলী, বিশেষ করে ধারা ২৪ (তালিকাভুক্তির শর্ত) এবং ধারা ৪৯ (বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা)-এর অধীনে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার (BCI) কি আইন পেশায় প্রবেশ বা আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো সর্বোচ্চ বা ঊর্ধ্ব বয়সসীমা (যেমন: ৪৫ বছর) নির্ধারণ করার কোনো আইনগত ক্ষমতা বা এখতিয়ার আদৌ ছিল কি না?
২. মূল আইনের পরিপন্থী বা ক্ষমতা বহির্ভূত কি না (Ultra Vires): দ্বিতীয় বিচার্য বিষয়টি ছিল—বার কাউন্সিল কর্তৃক নতুন করে প্রবর্তিত ‘রুল ৯’ (Rule 9) টি মূল আইন তথা ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের উদ্দেশ্য, কাঠামোগত পরিধি ও বিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ কি না, নাকি এটি মূল আইনের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে প্রণীত একটি অবৈধ বিধি (Ultra Vires the Act)?
৩. মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন (Violation of Fundamental Rights): তৃতীয় ও সাংবিধানিক বিচার্য বিষয়টি ছিল—আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ওপর এই বয়সসীমা বা ৪৫ বছরের বিধিনিষেধ আরোপ করা ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ (আইনের চোখে সমতা) এবং অনুচ্ছেদ ১৯(১)(জি) (যেকোনো পেশা বেছে নেওয়া বা জীবিকা নির্বাহের স্বাধীনতা)-এর মাধ্যমে নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকারগুলো প্রদান করা হয়েছে, সেগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন কি না?
মামলার রায়
- রুল ৯ বাতিল (Striking down Rule 9): সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া কর্তৃক প্রণীত ‘রুল ৯’ (Rule 9)—যাতে আইনজীবী পেশায় নতুন প্রবেশকারীদের সর্বোচ্চ বয়স ৪৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছিল—তাকে সম্পূর্ণভাবে অসাংবিধানিক, আইনগত এখতিয়ারবহির্ভূত (Ultra Vires) এবং বাতিল বলে ঘোষণা করেন।
- ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ: আদালত রায় দেন যে, ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট (Advocates Act, 1961)-এর বিধান অনুযায়ী বার কাউন্সিলকে কোনো নাগরিকের আইনি পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সর্বোচ্চ বা ঊর্ধ্ব বয়সসীমা (Upper age limit) আরোপ করার আইনি ক্ষমতা বা এখতিয়ার দেওয়া হয়নি।
- মৌলিক অধিকার সুরক্ষা: আদালত অভিমত প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের বয়সসীমা নির্ধারণী বিধি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ (আইনের চোখে সমতা) এবং অনুচ্ছেদ ১৯(১)(জি) (পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতার অধিকার)-এর পরিপন্থী।
রায়ের পেছনের কারণ
মামলাটি শুনানি ও নিষ্পত্তি করেছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ। তৎকালীন ভারতের প্রধান বিচারপতি এ. এম. আহমাদি (A. M. Ahmadi), বিচারপতি এস. মোহন (S. Mohan), বিচারপতি কে. এস. পারিপরনন (K. S. Paripoornan) এর যৌথ বেঞ্চ মামলাটি শুনানী ও নিষ্পত্তি করেন।
বার কাউন্সিলের পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি:
১. আইনি পেশার মর্যাদা, পবিত্রতা এবং পেশাগত উৎকর্ষ বা মান (Standards of professional conduct and etiquette) বজায় রাখার জন্য বার কাউন্সিলের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে।
২. বিভিন্ন সরকারি বা আধা-সরকারি চাকরি কিংবা অন্য কোনো পেশা থেকে অবসর নেওয়ার পর যে ব্যক্তিরা বয়স্ক অবস্থায় (৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সে) আইনি পেশায় প্রবেশ করেন, তাঁরা অতীতে তাঁদের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিকভাবে মামলা বাগানোর চেষ্টা করেন। এতে বারের তরুণ ও নতুন প্রবেশকারীদের সাথে একধরনের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয় এবং পেশার নীতি অবনমিত হয়।
৩. ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের ধারা ৪৯(১)(ag) এবং (ah)-এর প্রদত্ত ক্ষমতা বলে বারে প্রবেশাধিকার বা কোন ক্যাটাগরির লোক প্রবেশ করবে তা নিয়ন্ত্রণ করার এখতিয়ার বার কাউন্সিলের রয়েছে।
আবেদনকারী পক্ষ (Indian Council of Legal Aid & Advice ও অন্যান্য)-এর যুক্তি:
১. ১৯৬১ সালের মূল অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের ধারা ২৪ অনুযায়ী আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য যে শর্তগুলো দেওয়া আছে, সেখানে বয়স সংক্রান্ত কোনো ঊর্ধ্বসীমা (Upper age limit) বা প্রতিবন্ধকতা নেই।
২. বার কাউন্সিল যে রুল ৯ প্রণয়ন করেছে, তা মূল আইনের পরিধি বহির্ভূত বা ক্ষমতা বহির্ভূত (Ultra Vires)।
৩. নতুন প্রণীত বিধিটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ (আইনের চোখে সমতা) এবং অনুচ্ছেদ ১৯(১)(জি) (যেকোনো পেশা বা বৃত্তি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা)-এর মাধ্যমে নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, তার সরাসরি লঙ্ঘন। বয়স বেশি হওয়ার কারণে কাউকে পেশা থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক।
সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনার পর বার কাউন্সিলের রুল ৯ বাতিল ঘোষণা করেন এবং রায়ের পেছনের কারণগুলো নিম্নরূপভাবে ব্যাখ্যা করেন:
১. মূল আইনের সীমার বাইরে ক্ষমতা প্রয়োগ (Ultra Vires): ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের ধারা ২৪-এ তালিকাভুক্তির সুনির্দিষ্ট যোগ্যতাগুলো (যেমন: নাগরিকত্ব, ২১ বছর বয়স এবং আইনের স্নাতক ডিগ্রি) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। সংসদ আইনে সর্বোচ্চ কোনো বয়সসীমা আরোপ করেনি। তাই বার কাউন্সিল তাদের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা (Delegated legislation) প্রয়োগ করে মূল আইনের পরিধি অতিক্রম করতে পারে না।
২. তালিকাভুক্তি বনাম আইনচর্চার শর্তের পার্থক্য: আইনের ধারা ৪৯(১)(ah)-এর অধীনে বার কাউন্সিল কেবল তালিকাভুক্তির পরবর্তী সময়ে আইনজীবীদের আইনচর্চার শর্ত বা শিষ্টাচার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু কাউকে আইনজীবী হিসেবে তালিকায় নাম লেখানো বা এনরোলমেন্টের প্রক্রিয়াকেই পুরোপুরি আটকে বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা তাদের নেই।
৩. মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন (Violation of Fundamental Rights): একজন নাগরিক যখন আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন এবং তার বয়স ২১ বছর পূর্ণ হয়, তখন সংবিধানের ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর পছন্দসই পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার জন্মায়। কোনো সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি ছাড়া কেবল ৪৫ বছর বয়স হয়ে গেছে এই অজুহাতে কাউকে আইনি পেশা থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী ও খেয়ালী সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন- গ্রেফতার ও আটকের পার্থক্য
