স্টকহোম ঘোষণা ১৯৭২
মানব পরিবেশ বিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলনের ঘোষণা, স্টকহোম, ১৯৭২
(Declaration of the United Nations Conference on the Human Environment, Stockholm, 1972)
মানব পরিবেশ বিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলন, ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন, স্টকহোমে সম্মিলিত হয়ে, মানব পরিবেশের সংরক্ষন ও সম্প্রসারণের জন্য বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে ও দিক-নির্দেশনা দিতে একটি সম দৃষ্টিভঙ্গি ও সাধারণ নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে, ঘোষাণা করছে যে:
১। মানুষ একই সাথে তার পরিবেশের উপাদান ও গঠনকারী, যা তাকে দৈহিক পুষ্টি যোগায় ও বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক, সামাজিক ও আত্মিক বিকাশের সুযোগ করে দেয়। এ গ্রহে মানবজাতি তার দীর্ঘ ও জটিল বিবর্তনের ধারায় এমন একটি পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মাধ্যমে সে তার পরিবেশকে অগনিত উপায়ে ও অভূতপূর্ব মাত্রায় রূপান্তর করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। মানব কল্যাণ এবং মৌলিক মানবাধিকার অর্থাৎ জীবনের অধিকার উপভোগের জন্য মানব পরিবেশের প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট—উভয় দিকই অত্যাবশ্যক।
২। মানব পরিবেশের সুরক্ষা ও উৎকর্ষ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা বিশ্ব জুড়ে মানব কল্যাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করে; এটি সমগ্র বিশ্ব মানবের একান্ত আকাঙ্ক্ষিত এবং সব সরকারের কর্তব্য।
৩। মানুষ অনবরত অভিজ্ঞতা অর্জন করছে এবং আবিষ্কার, উদ্ভাবন, সৃষ্টি ও অগ্রযাত্রার পথে এগিয়ে চলছে। আমাদের এ সময়ে প্রতিবেশকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে মানুষ যে সক্ষমতা অর্জন করছে তার যথাযথ ব্যবহার জীবনে বয়ে আনতে পারে উন্নয়নের সুফল ও জীবনের মানোন্নয়নের সুযোগ। মানব ক্ষমতার ভুল ও অসাবধানী ব্যবহার মানব জাতি ও মানব পরিবেশের অপরিমেয় ক্ষতি সাধন করতে পারে। আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানব সৃষ্ট পরিবেশ দূষেণের নজির দেখতে পাচ্ছি। এর মধ্যে রয়েছে— পানি, বায়ু, ভূমি ও জৈব স্বত্ত্বার বিপজ্জনক মাত্রায় দূষণ জীবজগতের প্রতিবেশিক ভারসাম্যের (Ecological Balance) ওপর সৃষ্ট গুরুতর ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা অপূরণযোগ্য সম্পদের ধ্বংস ও ক্ষয়; এবং মানব-সৃষ্ট পরিবেশ, বিশেষ করে বসবাস ও কাজের পরিবেশে সম্পদের গুরুত্বর স্বল্পতা, যা তার দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
৪। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনুন্নয়নই বেশীর ভাগ পরিবেশ সমস্যার কারণ। লক্ষ- কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য ও বস্ত্র, আশ্রয় ও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যকর পয়ঃব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত থেকে সন্তোষজনক মানের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মাত্রায় চেয়েও বহু নিম্ন স্তরের জীবন ধারণ করে চলেছে। সে কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের অগ্রধিকার এবং পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে তাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে চালিত করতে হবে। সেই একই উদ্দেশ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলোর উচিত তাদের সাথে উন্নয়নশী দেশগুলোর ব্যবধান কমিয়ে আনার প্রয়াস গ্রহণ করা। শিল্পন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ সমস্যা সাধারণত শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত।
৫। জন্যসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সমস্যার সৃষ্টি করছে এবং এ সকল সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য ক্ষেত্রমতো পর্যাপ্ত নীতিমালা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ। সব কিছুর মধ্যে এ পৃথিবীতে মানুষই সবচেয়ে মূল্যবান। মানুষই চালিত করে সামাজিক প্রগতি, সৃষ্টি করে সামাজিক সম্পদ, উন্নত করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তাদের কঠোর শ্রমের দ্বারা অবিশ্রান্তভাবে রূপান্তর করে চলে মানব-পরিবেশ। সামাজিক প্রগতি উৎপাদন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির সাথে সাথে প্রতিনিয়তই পরিবেশ উন্নয়নে মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৬। ইতিহাসের এমন একটি মুহূর্তে সমাগত হয়েছে যখন পরিবেশগত পরিণতির কথা বিবেচনা করে সমগ্র বিশ্বে আমাদের কর্মকান্ডকে অধিকতর দূরদর্শিতা ও যত্নের সাথে বিন্যস্ত করতে হবে। অজ্ঞতা অথবা উদসীনতার মাধ্যমে আমরা পার্থিব পরিবেশের মারাত্মক ও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে ফেলতে পারি, যে পরিবেশের উপর আমাদের জীবন ও কল্যাণ নির্ভর করে। পক্ষান্তরে, অধিকতর জ্ঞান ও পরিণামদর্শী কর্মকান্ডের মাধ্যমে আমরা নিজেদের ও আমাদের উত্তরসূরীদের জন্য এমন পরিবেশ একটি উন্নতর জীবন অর্জন করতে পারি, মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরিবেশের মান বৃদ্ধি ও একটি সুন্দর জীবন গড়ে তোলার জন্য আমাদের সামনে রয়েছে এক অবারিত পথ। প্রয়োজন কেবল উদ্দীপ্ত কিন্তু প্রশান্ত মানসিক অবস্থা এবং প্রবল অথচ সুশৃংখল কর্মযজ্ঞ। প্রকৃতি জগতে স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রকৃতির সহযোগী হয়ে মানুষকে একটি উৎকৃষ্টতর পরিবেশ নির্মাণের জন্য তার জ্ঞানকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য মানব পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন একটি অত্যাবশ্যক লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিষ্ঠিত মৌলিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপায়ে ও এর সহগামী হিসেবে সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় পরিবেশ রক্ষার এ লক্ষ্যে অর্জন করতে হবে।
৭। এ পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন হবে সকল স্তরের নাগরিক ও সম্প্রদায় এবং উদ্যোক্তা (enterprise) ও প্রতিষ্ঠানের দয়িত্ব গ্রহণ। সকলেই সমবেত প্রচেষ্টায় যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এবং বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে স্ব স্ব মূল্যবোধ ও কর্মসমষ্টির মাধ্যমে ভবিষ্যত বিশ্ব পরিবেশকে রূপায়ণ করবে।
স্থানীয় ও জাতীয় সরকারগুলোর তাদের নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে বৃহত্তর আকারে পরিবেশগত নীতি প্রণয়ন ও কর্মোদ্যোগ গ্রহণের বিশাল রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে এক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে সেজন্য তাদের সহায়তার উদ্দেশ্যে সম্পদ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যপ্তিতে আঞ্চলিক অথবা বৈশ্বিক হওয়ার কারণে অথবা একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক অঞ্চলকে প্রভাবিত করার কারণে নব প্রকৃতির পরিবেশ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সাধারণ স্বার্থে জাতিগুলোর মধ্যে ব্যাপক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কর্মদ্যোগ প্রয়োজন ।
এ সম্মেলন সকল মানুষ ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের (Benefit) জন্য মানব পরিবেশের সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ও জনগণকে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োগ করার আহ্বান জানাচ্ছে।
নীতিমালা
মানব পরিবেশ বিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলন সম্মিলিত প্রত্যয় ব্যক্ত করছে যে;
নীতি-১
মানুষের স্বাধীনতা, সমতা ও জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার রয়েছে। সেটা হতে হবে এমন একটি মানবসম্পন্ন পরিবেশে যা তার একটি মর্যাদাপূর্ণ ও কল্যাণকর জীবন নিশ্চিত করে এবং সেসাথে সে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ রক্ষা ও মানোন্নয়নের একটি গুরু-দায়িত্ব বহন করে। এ লক্ষ্যে বর্ণবাদ, জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদ, বৈষম্য, ঔপনিবেশিক ও অন্যান্য ধরনের নিপড়ীন এবং বৈদেশিক আধিপত্যবাদের প্রচারণা ও প্রতিষ্ঠামূলক নীতিগুলো নিন্দার্হ ও তা আবশ্যই নিমূর্ল করতে হবে।
নীতি-২
বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের উপকারার্থে সযত্ম পরিকল্পনা বা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়ু, পানি, মাটি, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত এবং বিশেষত প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের প্রতিনিধত্বশীল নমুনাসহ পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদকে সুরক্ষিত করতে হবে।
নীতি-৩
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য সম্পদগুলো উৎপাদন করার ক্ষমতাকে বজায় রাখতে হবে ও ক্ষেত্রমতো পুনর্বহাল বা উন্নয়ন করতে হবে।
নীতি-৪
বন্য প্রাণীর উত্তরাধিকার ও তাদের বাসস্থানকে রক্ষা ও বিচক্ষণভাবে ব্যবস্থাপনা করা মানুষের একটি দায়িত্ব যা বিভিন্ন প্রতিকূল ঘটনার সমন্বয়ের কারণে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত সুতরাং অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় বন্যপ্রানীসহ প্রকৃতি সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নীতি-৫
পৃথিবীর অনবায়নযোগ্য সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ভয় না থাকে এবং যাতে করে মানবতার সকলের মধ্যে এর প্রয়োগের সুবিধা বন্টিত হয় ।
নীতি-৬
বাস্তুসংস্থানের ওপর মারাত্মক ও অপূরণীয় ক্ষতি যাতে না হয় তা নিশ্চিত করতে বিষাক্ত ও অন্যান্য পদার্থের নির্গমন ও তাপ অবমুক্তির পরিমাণ ও ঘনত্ব বৃদ্ধিকে অবশ্যই রোধ করতে হবে যতোটা বৃদ্ধি পেলে পরিবেশের পক্ষে তার ক্ষতির প্রভাব নিষ্ক্রিয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূষণের বিরুদ্ধে দূর্বল রাষ্ট্রগুলোর ন্যায়সঙ্গত লড়াইকে সমর্থন করা উচিত।
নীতি-৭
মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, জৈবিক সম্পদ ও সামুদ্রিক জীবের পক্ষে ক্ষতিকর, বিভিন্ন সুবিধাদি নষ্ট করে অথবা সাগরের অন্যান্য বৈধ ব্যবহারে হস্তক্ষেপ করে এমন বস্তু কর্তৃক সমুদ্র দূষণ রোধ করার জন্য রাষ্ট্রগুলো সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
নীতি-৮
মানুষের জন্য একটি অনুকূল বাসযোগ্য কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা ও মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য পৃথিবীতে প্রয়োজনীয় শর্ত সৃষ্টির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।
নীতি-৯
অনুন্নয়ন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব প্রচেষ্টার পাশাপাশি উন্নত বিশ্ব থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রয়োজন মতো অন্যান্য সময়োচিত সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে উন্নয়নে গতি সঞ্চার করে এ সমস্যার প্রতিবিধান করা যায়।
নীতি-১০
পরিবশেগত ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি ও কাঁচামালের স্থিতিশীল মূল্য ও পর্যাপ্ত আয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কেননা অর্থনৈতিক বিষয়ালী ও সেসাথে প্রতিবেশগত পদ্ধতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
নীতি-১১
সকল রাষ্ট্রের পরিবেশনীতি এমন হতে হবে যা উন্নয়শীল রাষ্ট্রগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যত উন্নয়ন সম্ভাবনাকে আরো সম্প্রসারণ করে এবং এ সম্ভাবনার ওপর কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, সেসাথে সকলের জন্য উন্নত এর বাসযোগ্য অবস্থা অর্জনেও কোন বাধা দেয় না। পরিবেশগত পদক্ষেপ প্রয়োজনের ফলে উদ্ভূত সম্ভাব্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফলাফল মোকাবেলার জন্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ।
নীতি-১২
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা ও সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং উন্নয়ণ পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপের অন্তর্ভুক্তির ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রাপ্যতা থাকতে হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনুরোধক্রমে ও উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সহায়তার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
নীতি-১৩
সম্পদের অধিকরত যৌক্তিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অর্জন এবং তার মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রগুলোর উচিত তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা, যাতে তাদের জনগণের স্বার্থে পরিবেশ রক্ষা ও সমৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার সাথে উন্নয়ন কর্মকান্ডে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
নীতি-১৪
যুক্তিসিদ্ধ পরিকল্পনা হচ্ছে উন্নয়ন প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবেশ রক্ষা ও সমৃদ্ধির প্রয়োজনীতার মাঝে দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি অতি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার।
নীতি-১৫
পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে এবং সকলের জন্য সর্বোচ্চ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে মানব বসতি ও নগরায়ন প্রক্রিয়ার অবশ্যই পরিকল্পনার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক ও জাতিগত আধিপত্যবাদের উদ্দেশ্যে প্রণীত প্রকল্পগুলো অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে।
নীতি-১৬
যেসব অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অথবা অতিরিক্ত জন্যসংখ্যা মানব পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে ও উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্ত করতে পারে, সেসব স্থানে মৌলিক মানবাধিকারের সাথে বিরোধপূর্ণ নয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো যেমনটা যথাযথ মনে করে তেমন জনসংখ্যা বিষয়ক নীতি প্রয়োগ করা উচিত।
নীতি-১৭
পরিবেশগত মান বৃদ্ধির জন্য যথাযোগ্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রের ৯টি সম্পদের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা অথবা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে।
নীতি-১৮
অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে রাখা অবদানের অংশ হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পরিবেশগত ঝুঁকি চিহ্নিত, পরিহার ও নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত সমস্যার সমাধান ও মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের জন্য প্রয়োগ করতে হবে।
নীতি-১৯
সুবিধা বঞ্চিতদের বিশেষ অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে নতুন প্রজন্ম ও সেসাথে প্রাপ্ত বয়স্কদের পরিবেশগত বিষয়ে শিক্ষা প্রদান অত্যন্ত জরুরী, যাতে করে পূর্ণাঙ্গ মানবীয় ব্যাপ্তিতে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের পক্ষে সজ্ঞান মতামত এবং ব্যক্তি, সংস্থা ও সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল আচরণের ভিত্তি প্রশস্ত হয়। এটাও অত্যন্ত প্রয়োজন যে, গণমাধ্যম পরিবেশ বিপর্যয়ের ভূমিকা না রেখে বরং মানুষের সার্বিক উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনাকারী শিক্ষামূলক তথ্য প্রচার করবে।
নীতি-২০
সব দেশেই বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জাতীয় ও বহুজাতিক পরিবেশগত সমস্যার উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উন্নয়কে ত্বরান্বিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশগত সমস্যার সমাধানকে সহজতর করার জন্য সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানকে সমর্থন ও সহায়তা করতে হবে। এমন শর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিকট পরিবেশ প্রযুক্তির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তাদের ওপর কোন অর্থনৈতিক বোঝা ব্যতিরেকেই সেগুলোর ব্যাপক বিস্তৃত ঘটতে পারে।
নীতি-২১
জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা সাপেক্ষে রাষ্ট্রগুলোর তাদের নিজস্ব পরিবেশ সংক্রান্ত নীতি অনুযায়ী নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং সেসাথে এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে যে তাদের নিজস্ব অধিক্ষেত্রভুক্ত বা নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে পরিচালিত কর্মকান্ডের দরুন যাতে অন্য রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় অধিক্ষেত্র বহির্ভূত অঞ্চলের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়৷
নীতি-২২
রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব অধিক্ষেত্রভুক্ত বা নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে পরিচালিত কর্মকান্ডের দরুন সৃষ্ট পরিবেশ দূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষতির শিকার ব্যক্তিদের ব্যাপারে দায়দায়িত্ব ও ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইনকে আরো উন্নতর করার জন্য পরষ্পরকে সহযোগিতা করবে।
নীতি-২৩
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐকমত্য পোষণ করছে এমন মানদন্ড বা জাতীয়ভাবে নির্ধারিতব্য মানদন্ডকে ক্ষুন্ন না করে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে পরিবেশগত মানদন্ড নির্ধারনে প্রত্যেক রাষ্ট্রের প্রচলিত মূল্যবোধকে বিবেচনায় রাখতে হবে এবং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, সবচেয়ে উন্নত রাষ্ট্রের জন্য যে মানদন্ড উপযোগী তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুপযোগী ও অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক মূল্য দাবি করতে পারে।
নীতি-২৪
ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকেই সমমর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থেকে সহযোগিতামূলক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী পরিচালনা করতে হবে। সর্বস্তরে পরিচালিত কর্মকান্ড থেকে উদ্ভূত প্রতিকূল পরিবেশগত প্রভাবকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ, হ্রাস ও নিরসনের জন্য বহুপাক্ষিক অথবা দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা অথবা অন্যান্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থের দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
নীতি-২৫
আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো যাতে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য সমন্বিত, কার্যকর ও গতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে সে ব্যাপারটি রাষ্ট্রগুলো নিশ্চিত করবে।
নীতি-২৬
মানব ও তার পরিবেশকে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্য সর্ব প্রকার গণবিধ্বংসী অস্ত্রের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এ ধরনের অস্ত্র বর্জন ও সম্পূর্ন ধ্বংসের ব্যাপারে রাষ্ট্রগুলো সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ফোরামে দ্রুত মতৈক্যে, পৌছানোর জন্য অবশ্যই চেষ্টা করবে।
২১ তম পূর্ণাঙ্গ সভা
১৬ জুন, ১৯৭২
সোর্স- UN Website
আরও পড়ুন- মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র ১৯৪৮
