ExplanationHome

মুসলিম আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার

মুসলিম আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার

ইসলামী আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার একটি অনন্য ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা। পশ্চিমা আইনে বিংশ শতাব্দীর পূর্বেও যেখানে বিবাহিত নারীর নিজস্ব সম্পত্তির একক মালিকানা ছিল না, সেখানে ১৪০০ বছর আগে ইসলাম নারীকে সম্পত্তির সম্পূর্ণ স্বাধীন ও একক মালিকানা দিয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সূরা নিসা আয়াত ৭ এ আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, “পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত।”

আয়াত ১৯ এ বলা হয়েছে “এই আয়াতে নারীদের ওপর জুলুম, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ এবং জোরপূর্বক অধিকার কেড়ে নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”

সহিহ মুসলিম শরীফ মতে বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, “পুরুষদের নারীদের সঙ্গে সদাচরণ এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।”

 

মুসলিম আইনে একজন নারী প্রধানত ৫টি উপায়ে সম্পত্তি লাভ করেন। কোরআন, হাদিস এবং মুসলিম ফিকহবিদদের (জুরিস্ট) মতামতসহ এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

 

. দেনমোহর (Mahr):

দেনমোহর হলো নারীর এমন একটি বিশেষ অধিকার, যা বিয়ের সময় স্বামী তার স্ত্রীকে দিতে বাধ্য। যা কোনো উপহার বা যৌতুক নয়, বরং নারীর একটি আইনি ও আর্থিক নিরাপত্তা। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসা আয়াত ৪ এ বলা হয়েছে, “আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর খুশী মনে দিয়ে দাও…”

সূরা বাকারা আয়াত ২৩৬ এ বলা হয়েছে, “স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করার আগে এবং কোন মোহর সাব্যস্ত করার পূর্বেও যদি তালাক দিয়ে দাও, তবে তাতেও তোমাদের কোন পাপ নেই। তবে তাদেরকে কিছু খরচ দেবে। আর সামর্থ্যবানদের জন্য তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এবং কম সামর্থ্যবানদের জন্য তাদের সাধ্য অনুযায়ী। যে খরচ প্রচলিত রয়েছে তা সৎকর্মশীলদের উপর দায়িত্ব।”

হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী—৪ প্রধান মাযহাবের ফকিহদের মতেই দেনমোহরের উপর সম্পূর্ণ অধিকার শুধু স্ত্রীর। তার অনুমতি ছাড়া বাবা, ভাই বা স্বামী কেউই দেনমোহরের অর্থ স্পর্শ করতে পারবে না। স্ত্রী চাইলে বিয়ের পর যেকোনো সময় তার সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করতে পারে এবং তা পরিশোধ না করা পর্যন্ত স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার অধিকারও রাখে।

 

২. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি (Inheritance):

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, নারী যেকোনো পরিস্থিতিতেই সম্পত্তি থেকে একেবারে বঞ্চিত হন না। সাধারণত পুরুষদের তুলনায় নারীদের অংশ অর্ধেক মনে হলেও, এর পেছনে একটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য রয়েছে (কারণ নারীর উপর কোনো পারিবারিক ভরণপোষণের দায়িত্ব আইনত নেই, যা পুরুষের আছে)।

সূরা আন-নিসার ১১, ১২ এবং ১৭৬ নম্বর আয়াতে নারীর উত্তরাধিকার সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। নারী মূলত ৪টি প্রধান সম্পর্কে সম্পত্তি পান:

ক. কন্যাসন্তান হিসেবে

মা-বাবার যদি কোনো ছেলেসন্তান না থাকে এবং শুধু একজন কন্যাসন্তান থাকে, তবে সে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবে। যদি একাধিক কন্যাসন্তান থাকে (কোনো ছেলেসন্তান না থাকে), তবে তারা সবাই মিলে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সমানভাগে পাবে (সূরা আন-নিসা: ১১)।

ভাই-বোনের সম্পর্ক: যদি ভাই ও বোন একসাথে থাকে, তবে ভাই বোনের দ্বিগুণ পাবে (২:১ অনুপাতে)।

খ. স্ত্রী হিসেবে

স্বামীর মৃত্যুর পর যদি তাদের কোনো সন্তান বা সন্তানের সন্তান (নাতি/নাতনি) না থাকে, তবে স্ত্রী মোট সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ (১/৪) পাবেন। আর যদি সন্তান থাকে, তবে স্ত্রী পাবেন এক-অষ্টমাংশ (১/৮) (সূরা আন-নিসা: ১২)।

গ. মাতা হিসেবে

মৃত সন্তানের যদি কোনো সন্তান বা একাধিক ভাই-বোন থাকে, তবে মা পাবেন মোট সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬)। আর যদি কোনো সন্তান বা একাধিক ভাই-বোন না থাকে, তবে মা পাবেন এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) (সূরা আন-নিসা: ১১)।

ঘ. বোন হিসেবে

মৃত ব্যক্তির সন্তান বা বাবা বেঁচে না থাকলে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে বোনও (সহোদর, বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রীয়) ভাইদের সাথে বা নির্দিষ্ট অংশে সম্পত্তি লাভ করেন।

 

৩. হেবা বা দান (Gift/Hiba):

একজন মুসলিম নারী তার জীবনদ্দশায় যেকোনো ব্যক্তির কাছ থেকে (বাবা, মা, স্বামী বা অন্য কেউ) সম্পত্তি ‘হেবা’ বা দান হিসেবে পেতে পারেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, এর ফলে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ)

মুসলিম জুরিস্টদের মতে, হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত আবশ্যক: দানের ঘোষণা (Declaration), গ্রহীতার সম্মতি (Acceptance), এবং সম্পত্তির দখল হস্তান্তর (Delivery of Possession)। নারী হেবা সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার পর তার ওপর পূর্ণ মালিকানা লাভ করেন।

 

. ওসিয়ত বা উইল (Will):

কোনো ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার জন্য তার সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) কোনো অ-উত্তরাধিকারীকে (যিনি আইনত ওয়ারিশ নন) ওসিয়ত করে যেতে পারেন।

যদি কোনো নারী মৃত ব্যক্তির সরাসরি উত্তরাধিকারী না হন (যেমন: দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয় বা পুত্রবধূ), তবে তিনি ওসিয়তের মাধ্যমে সম্পত্তি পেতে পারেন। তবে জুরিস্টদের সর্বসম্মত মত (হাদিস: “লা ওসিয়্যাতা লি ওয়ারিস”) অনুযায়ী, কোনো আইনি উত্তরাধিকারীর (যেমন নিজের আপন মেয়ে বা স্ত্রী) অনুকূলে ওসিয়ত করা যায় না, যদি না মৃত্যুর পর অন্য সব ওয়ারিশরা তাতে সম্মতি দেয়।

 

. খোরপোশ বা ভরণপোষণ (Maintenance/Nafaqah):

ইসলামী আইন অনুযায়ী, একজন নারীর নিজের কোটি টাকা থাকলেও তার ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুরুষের। বিয়ের আগে বাবা ও ভাইয়ের, বিয়ের পর স্বামীর, এবং বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের।

সূরা আত-তালাক আয়াত ৭ এ বলা হয়েছে, “বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে…”

সূরা বাকারা আয়াত ২৪১ এ বলা হয়েছে “আর তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী খরচ দেয়া পরহেযগারদের উপর কর্তব্য।”

স্বামী যদি খোরপোশ না দেন, তবে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে স্বামীর সম্পত্তি থেকে তার পাওনা আদায় করার আইনি অধিকার রাখেন। এমনকি ডিভোর্সের পর ইদ্দতকালীন সময়েও নারী এই খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী।

 

নারীর সম্পত্তির একক মালিকানা স্বাধীনতা

মুসলিম আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো “Absolute Ownership” বা নিরঙ্কুশ মালিকানা।

১. ব্যয় করার স্বাধীনতা: একজন মুসলিম নারী তার সম্পত্তি যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার, বিক্রি, দান বা উইল করতে পারেন। এর জন্য স্বামী বা বাবার অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই।

২. ব্যবসায়িক অধিকার: একজন মুসলিম নারী নিজস্ব সম্পত্তিতে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারেন এবং সেই ব্যবসার সম্পূর্ণ লাভের অধিকার শুধু তারই।

৩. ঋণের দায়:  স্ত্রীর কোনো ব্যক্তিগত ঋণের জন্য স্বামীর সম্পত্তি যেমন দায়ী নয়, তেমনি স্বামীর ঋণের দায় মেটাতে স্ত্রীর সম্পত্তি বা দেনমোহরের টাকা ক্রোক করা আইনত নিষিদ্ধ।

 

এ ছাড়াও সম্পত্তিতে নারীদের অধিকার সম্পর্কে আরও কিছু বিষয়-

১. নারীর পৃথক আইনগত সত্তা (Separate Legal Personality):

Separate Legal Personality অর্থ হলো একজন নারী বিবাহের আগে ও পরে একজন স্বাধীন আইনগত ব্যক্তি। বিবাহের ফলে তার নিজস্ব সম্পত্তি, দেনমোহর, উপার্জন বা উত্তরাধিকার স্বামীর সম্পত্তিতে পরিণত হয় না। এটি মুসলিম আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি।

সূরা আন-নিসা (আয়াত-৩২) এ আল্লাহ বলেন— “পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জিত সম্পদের অংশ এবং নারীদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জিত সম্পদের অংশ।”

নারী নিজের উপার্জনের পূর্ণ মালিক। স্বামীর অনুমতি ছাড়াই বৈধ সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন।

সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সাহাবিয়ারা নিজেদের সম্পদ থেকে সদকা দিতেন এবং তিনি তা গ্রহণ করতেন। এতে বোঝা যায়, নারীর নিজস্ব সম্পদের ওপর স্বাধীন মালিকানা ছিল।

আরও দেখা যায়, নবীজী (সা.) এর স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরা (রা.) Khadijah bint Khuwaylid ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী এবং তাঁর ব্যবসায়িক সম্পদের ওপর তাঁর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ছিল।

ইসলামি আইনজ্ঞ D. F. Mulla বলেন, “বিবাহের ফলে নারীর সম্পত্তির মালিকানা নষ্ট হয় না।”

Syed Ameer Ali বলেন, “ইসলাম নারীর সম্পত্তিকে পুরুষের সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।“

Abdur Rahim বলেন, “মুসলিম নারী একজন পূর্ণাঙ্গ আইনগত ব্যক্তি; তিনি চুক্তি করতে, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় করতে এবং আদালতে মামলা করতে সক্ষম।”

 

২.  উত্তরাধিকারী হিসেবে বঞ্চিত না হওয়ার অধিকার (Doctrine of Radd বা ‘প্রত্যাবর্তন’):

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে যাকে ‘রাদ’ (Radd) বলা হয়। যদি কোনো মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের পর সুনির্দিষ্ট অংশীদারদের (যেমন: কন্যা বা মাতা) অংশ দেওয়ার পর সম্পত্তি উদ্বৃত্ত বা অবশিষ্ট থাকে এবং কোনো আসাবা (অবশিষ্টভোগী পুরুষ আত্মীয়) না থাকে, তবে সেই অবশিষ্ট সম্পত্তি অনুপাত অনুযায়ী আবার সেই নারীদের কাছেই ফেরত আসে।

এর ফলে সম্পত্তি কোনো দূর সম্পর্কের পুরুষ আত্মীয়ের কাছে না গিয়ে সরাসরি ঘরের নারী উত্তরাধিকারীদের (কন্যা বা মাতা) মালিকানায় ফিরে আসে, যা তাদের আর্থিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করে।

 

৩. খাস জমি বা কৃষি জমির সম-অধিকার:

অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে, অকৃষি বা বসতভিটা ছাড়া কৃষি জমিতে নারীর অধিকার নেই। কিন্তু মুসলিম আইন অনুযায়ী, সম্পত্তি স্থাবর (জমি, বাড়ি) হোক কিংবা অস্থাবর (টাকা, গয়না, কোম্পানির শেয়ার), সব ধরনের সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সমান ও অপরিবর্তনীয়।

 

৪. মাতার গর্ভে থাকা সন্তানের অধিকার (Womb/Foetus Inheritance):

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, একজন নারী যখন গর্ভবতী হন, তখন তার গর্ভস্থ সন্তানের (তা যদি কন্যাসন্তানও হয়) সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকে। সন্তান জীবিত জন্ম নিলে সে পূর্ববর্তী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে তার নির্দিষ্ট অংশ লাভ করবে।

 

৫.পিতা-মাতার সম্পত্তি ত্যাগে বাধ্য করার নিষেধাজ্ঞা:

অনেক পরিবারে বোনদেরকে ভাইদের অনুকূলে সম্পত্তি ‘দাবি ছেড়ে দেওয়া’ বা ‘স্বেচ্ছায় ত্যাগ’ (যাকে ফিকহের ভাষায় ‘তাখারুজ’ বা Renunciation) করার জন্য সামাজিক চাপ দেওয়া হয়। মুসলিম জুরিস্টদের মতে, কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি বা মানসিক চাপে পড়ে নারীরা যদি অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ।

উত্তরাধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন: “যে ব্যক্তি তার কোনো ওয়ারিশের (উত্তরাধিকারীর) অংশ কেটে নেবে বা বঞ্চিত করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার অংশ কেটে নেবেন।” (সুনান ইবনে মাজাহ)

 

৬. খোরপোশ ও দেনমোহরের অগ্রাধিকার:

কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা যান, তবে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে প্রথমে কাফন-দাফন এবং ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর দেনমোহরকে ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ঋণ’ (Secured Debt) হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, সাধারণ পাওনাদারদের টাকা দেওয়ার আগেই মৃত স্বামীর সম্পত্তি থেকে স্ত্রীর দেনমোহরের বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে হবে।

 

মুসলিম নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত প্রচলিত আইনসমূহ

বাংলাদেশে মুসলিম নারীর সম্পত্তির অধিকার মূলত মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যার প্রধান উৎস হলো আল-কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। এ ছাড়াও কয়েকটি প্রচলিত আইন নারীর সম্পত্তির অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১. বাংলাদেশের সংবিধান

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ আইনের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমতা এবং অনুচ্ছেদ ২৮ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার প্রতি বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। ফলে মুসলিম নারীও সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় সমানভাবে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন। ৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সম্পত্তি অধিকার এবং সংরক্ষণ করতে পারেন।

২. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১:

এটি মুসলিম পারিবারিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। এতে বিবাহ নিবন্ধন, বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণ, তালাকের বিধান এবং উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। বিশেষ করে ধারা ৪ অনুযায়ী, কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতার পূর্বে মারা গেলে তার সন্তানরা (নাতি-নাতনি) প্রতিনিধিত্বের নীতিতে (Representation Principle) উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে। এছাড়া দেনমোহরকে স্ত্রীর আইনগত অধিকার হিসেবে কার্যকর করার ক্ষেত্রেও এই আইন গুরুত্বপূর্ণ।

৩. পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩:

এই আইনের অধীনে পারিবারিক আদালত দেনমোহর, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার, সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে। দেনমোহর আদায়ের জন্য মুসলিম নারী এই আইনের অধীনে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।

৪. মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন ১৯৭৪:

এই আইনের মাধ্যমে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ থাকায় পরবর্তীতে তা আদায়ের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৫. সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ :

এই আইনের অধীনে নারী তার সম্পত্তির মালিকানা, দেনমোহর বা উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত দাবি আদালতে দলিল, সাক্ষ্য ও অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

৬. তামাদি আইন ১৯০৮ :

সম্পত্তি ও দেনমোহর-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দায়ের করতে হয়। এ আইন মামলার সময়সীমা নির্ধারণ করে বিচারপ্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে।

 

গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিচারিক সিদ্ধান্ত

১ Hamira Bibi v. Zubaida Bibi (1916)

স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর (Dower) আদায় নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ছিল—দেনমোহর কি কেবল পারিবারিক দাবি, নাকি এটি আইনের দৃষ্টিতে একটি ঋণ (Debt)?

প্রিভি কাউন্সিল রায় দেন যে দেনমোহর স্বামীর সম্পত্তির উপর একটি ঋণ (Debt)। তাই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের আগে দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম দেনমোহর মামলার ক্ষেত্রে অন্যতম ভিত্তিমূলক বিচারিক সিদ্ধান্ত (precedent)।

 

২. Mohd. Ahmed Khan v. Shah Bano Begum (1985)

তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারী শাহ বানো তার সাবেক স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ দাবি করেন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মুসলিম নারীও ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। এটি সম্পত্তির উত্তরাধিকার নয়, বরং ভরণপোষণ (Maintenance)-সংক্রান্ত মামলা।

 

৩ Danial Latifi v. Union of India (2001)

ভারতের Muslim Women (Protection of Rights on Divorce) Act, 1986-এর ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীর ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কতটুকু? সুপ্রিম কোর্ট বলেন, স্বামীকে ইদ্দতকালের মধ্যেই এমন আর্থিক ব্যবস্থা করতে হবে, যা স্ত্রীর ভবিষ্যৎ জীবিকার জন্যও যথাযথ হতে পারে।

 

মুসলিম আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আধুনিক যুগে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাধিকার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, আইনবিদ ও গবেষক ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন। একদিকে কেউ মনে করেন ইসলামী আইন নারীর অধিকার যথেষ্ট সুরক্ষা দিয়েছে, অন্যদিকে কেউ বলেন যে কিছু বিধান সমসাময়িক সমতার ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, (সূরা আন-নিসা, আয়াত ১১)-এর কিছু পরিস্থিতিতে পুত্রের অংশ কন্যার দ্বিগুণ নির্ধারণ করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি নারী-পুরুষের সমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই বিষয়ে মুসলিম আইনবিদদের মন্তব্য হলো-

মুসলিম আইনবিদদের মতে, উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পুরো পারিবারিক দায়িত্বের কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে। স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন করেন। স্ত্রী তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিজের জন্য সংরক্ষণ করতে পারেন। স্ত্রী সংসারে ব্যয় করতে আইনগতভাবে বাধ্য নন। এই কারণে কিছু ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারের অংশে পার্থক্য রাখা হয়েছে।

উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টা আর একটু সহজভাবে বলা যেতে পারে –

“একজন বাবা তার মেয়ে এবং ছেলেকে ঘুরতে যাওয়ার জন্য ১০০০ টাকা দিলেন এবং তার ছোট ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব বড় বোনকে দিলেন। তিনি ছেলেকেও ৫০০ টাকা দিলেন। ঘুরতে গিয়ে বোন তার ছোট ভাইকে নিজের টাকা দিয়ে আইসক্রিম, চকলেট আর যা যা সে খেতে চাইলো কিনে দিলো এবং রিক্সা ভাড়া, বাস ভাড়াসহ যাবতীয় খরচ দিলো। বাড়িতে ফিরে আাসার পর তার কাছে আর ৫০০ টাকা রইলো। এখন আপাতঃদৃষ্টিতে ছেলেকে কম টাকা দিয়েছেন বলে মনে হলেও আসলে কিন্তু ২ জনের টাকার পরিমাণই সমান কারণ বাবা মেয়েকে বেশি টাকা দিলেও তার ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব ও তাকে দিয়েছেন অন্যদিকে ছেলেকে টাকা কম দিলেও কোন রকম দায়িত্ব দেননি। ইসলাম ধর্মেও নারীদের উপর কোন দায়িত্ব থাকে না বরং পুরুষের উপর নারীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

 

দ্বিতীয়ত, সামাজিক বাস্তবতায় নারী উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। ইসলাম নারীর উত্তরাধিকারকে ফরজ অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। কুরআনে নির্ধারিত অংশ থেকে বঞ্চিত করা শরিয়তসম্মত নয়।

সমস্যাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইন বা ধর্মীয় বিধানের নয়; বরং এর সঠিক প্রয়োগের।

তৃতীয়ত, অনেক সময় কাবিননামায় অত্যন্ত বেশি মহর লেখা হলেও বাস্তবে তা পরিশোধ করা হয় না।

ইসলামী আইন অনুযায়ী— মহর স্ত্রীর আইনগত অধিকার। এটি আদালতের মাধ্যমে আদায়যোগ্য। স্বামীর মৃত্যুর পরও মহর ঋণ হিসেবে আদায় করা যায়। অতএব, সমস্যা আইনের নয়; বাস্তব প্রয়োগের।

এ রকম আর ও অনেক সমালোচনামূলক প্রশ্ন রয়েছে।

 

পরিশেষে,বলা যায় যে, মুসলিম আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম নারীর পৃথক আইনগত সত্তা স্বীকৃতি দিয়ে তাকে দেনমোহর, উত্তরাধিকার, হেবা, ওয়াসিয়ত, বৈধ উপার্জন এবং অন্যান্য সম্পত্তির ওপর স্বাধীন মালিকানা প্রদান করেছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থা এই অধিকার বাস্তবায়নের কাঠামোগত ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে বাস্তব জীবনে নারীরা এখনও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। তাই আইনের কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রীয় আইন—উভয়ের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মুসলিম নারীর সম্পত্তির অধিকার আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হতে পারে।

*লেখক: মরিয়ম আক্তার বৃষ্টি: আইনের শিক্ষার্থী; কন্ট্রিবিউটর, জুরিস্টিকো। 

 

আরও পড়ুন- মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি বণ্টনের আদ্যোপান্ত

 

You cannot copy content of this page